আত্মা জাগরন ছাড়া ঈশ্বরের দর্শন অসম্ভব ।।

আত্মা জাগরন? নতুন শোনাচ্ছে কি? পশ্চিমে এটা একটা বহুল প্রচলিত বিষয়। যাকে ইংরেজী ভাষায় বলে স্পিরিচুয়াল এওকেনিং (spiritual awakening)। এটাকে এক প্রকার সিদ্ধি বলা যেতে পারে। যদিও আমি বলি নিজেকে চিনে নেওয়ার জন্যে জানালা খোলা। বা বলা যায় জোর করে সন্ন্যাসী বানানো।

এই আত্মার জাগরন সবার হয় না। সারা পৃথিবীতে খুব কম লোকের এই জাগৃতি হয়। বিভিন্ন ভাবে এটা হতে পারে। যদিও সবগুলোই পূর্ব জন্মের কর্মের সুফলেই হয়। বহু জন্মের পুণ্যের ফলেই আত্মা জেগে ওঠে মানব জীবনের জীবদ্দশায়। যাকে বলা হয় এক নবজন্ম প্রাপ্তি।

আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য আত্মা জাগরন অবশ্যক। মানে বলা যেতে পারে আত্মা জাগৃতি ছাড়া আধ্যাত্মিকতার মুল পর্বে যাওয়াই যায় না। সারা পৃথিবীতে কতো মানুষ এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কখন ডাক আসবে। নিজেকে না জানলে ঈশ্বরকে জানা বা বোঝা সম্ভব নয়।

কিছু মানুষের আত্মা জন্ম থেকে অল্প বিস্তর জাগ্রত থাকে। বিশেষত যারা নামী সাধক, অবতার প্রভৃতি। বয়সকালে তা পূর্ণতা লাভ করে আত্মা জাগরন সিদ্ধির মাধ্যমে। এবং এই সিদ্ধি অনেক অলৌকিক শক্তি নিয়ে আসে। এটা একটা দৈবিক পর্ব। কেউ নিজের থেকে আত্মাকে জাগ্রত করতে পারে না। অনেকেই নিজের থেকে সন্ন্যাসী হয় কিন্তু আত্মা জাগ্রত না হলে সন্ন্যাস সম্পূর্ণ অর্থহীন। সেই সন্ন্যাসীর কোন রকম সিদ্ধি সম্ভব নয়। তা সে যত বড় সাধক হোক না কেন, বা যত সাধনাই করে থাকুক না কেন।

যখন বীর্য লিঙ্গ থেকে নির্গত হয়ে যোনি তল স্পর্শ করে তখন সেই ব্রহ্ম মূহুর্তে শ্রেষ্ঠ বীর্য কনায় বা কোষে আত্মা এসে বসে। অনেকেরই ধারণা যে বীর্য কনা / কোষ সমূহের জরায়ূতে অবস্থিত ডিম্বের দিকে যাওয়া একটি প্রতিযোগিতা। বাস্তবে কিন্তু তা নয়, জন্ম ও মৃত্যু ঈশ্বরের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হয়ে থাকে। কোন বীর্য কনা বা কোষ ডিম্বানু ভেদ করবে তা অবশ্যই পূর্ব নির্ধারিত। বাকিরা তাকে সাহায্য করে মাত্র। যে যোগী তাঁর তৃতীয় নয়ন জাগ্রত করেছেন, কেবল সেই এই যাত্রাপথের দৃশ্য দেখেছেন।

ডিম্বানু স্পর্শের সময় হলো দ্বিতীয় ব্রহ্ম মুহূর্ত। তখন আত্মা ঈশ্বরের নিয়মে গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হয়। কেবল মাত্র বিশেষ কিছু ব্যাক্তি ভূমিষ্ঠ বা জন্ম লাভের সময় তাদের আত্মা স্বল্প মাত্রায় জাগ্রত থাকে। বয়সের এক বিশেষ সময়ে সেই সমস্ত ব্যাক্তির আত্মা সম্পূর্ণ রূপে জাগরিত হয়। আর অন্য সব ব্যাক্তিগন যাদের আত্মা জাগরন ঘটে। তা তাদের মানব জীবনের যে কোন পর্বে ঘটতে পারে। কোনো বয়সের সময় সীমা নেই। এটা ঠিক হয় মূলত তার গন্তব্যের উপর।

বিভিন্ন ভাবে আত্মা জাগ্রত হয়। সেগুলো হল মৃত্যু উপলব্ধি, ধ্যান, সৃজনী কর্ম, মানসিক আঘাত, আধ্যাত্মিক তীর্থ দর্শন, এবং কখনো কখনো স্বপ্নের মাধ্যমে আত্মা জাগ্রত হয়। এর মধ্যে মৃত্যু উপলব্ধি সর্ব শ্রেষ্ঠ। যাকে ইংরেজী ভাষায় নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স বলে। আত্মার জাগরন ঘটলে জীবন, ভাবনা, মানসিকতা ও চেতনার উন্মেষ ঘটে। যা জাগৃতির আগের জীবনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। শুধু জীবনই নয়, ভাগ্যেরও সম্পূর্ণ রুপে পরিবর্তন ঘটে।

এই আত্মার জাগরনে যে বিভিন্ন পর্যায় গুলো ঘটে সেগুলো নিম্ন বর্ণিত :

১) আত্মা জাগরনকে অনেকেই ঈশ্বর দর্শন বা উপলব্ধি থেকে আলাদা ভাবেন। কিন্তু এটাই ঈশ্বর উপলব্ধির একমাত্র পথ। যা ভিতর থেকে আসে বহু জন্মের কর্মের সুফলেই। জাগৃতির পর প্রথম যে উপলব্ধি হয়, তা হল আত্মার উপস্থিতির সচেতনতা লাভ। এবং তার সাথে ঘটে চেতনার গভীরে ঝাঁপ দেওয়ার সামর্থ্য। তখন সেই ব্যক্তি তার আগের জীবনের পুনর্মূল্যায়ন করে। এবং একটি আত্মিক জগৎ বা আধিভৌতিক জগতের সমান্তরাল অস্তিত্বের উপলব্ধি ঘটে।

যার আত্মার জাগরন হয়েছে সে বিদেহী আত্মার কথা শুনতে পায়। তারা বিভিন্ন ভাবে তার থেকে সাহায্য প্রার্থনা করে। কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে তা শোনা সম্পূর্ন রুপে অসম্ভব। দরজায় বেলের বা ঘন্টার শব্দ একটি বহুল সুবিদিত অভিজ্ঞতা।

২) জীবন মৃত্যু উপলব্ধি। জাগরণের পর জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়। এই উপলব্ধি হয় যে, মৃত্যু শেষ নয় বরং পুনরায় নতুন করে শুরু। আগে প্রিয়জনের মৃত্যুতে যে শোক হতো তা থেকে নিষ্কৃতি ঘটে।

৩) বস্তুবাদী জীবন থেকে আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ। বস্তুবাদী জীবনের আনন্দ আর মনকে আন্দোলিত করে না। নিঃসঙ্গতা ভালো লাগে শুধু তাই নয়। জীবন নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। পরিবার, পরিজন, বন্ধু বান্ধবের থেকে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। তারা আর আত্মা জাগ্রত ব্যাক্তির কথা বুঝতে পারে না। অনেকেই ধরে নেয় সে মানসিক বিকারগ্রস্ত। বহু ক্ষেত্রেই তাকে চিকিৎসক বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। নতুন আধ্যাত্মিক জীবনের স্বাদ নিতে আনন্দ অনুভূতি হয়।

৪) ঈশ্বর উপলব্ধি। জাগরণের ফলে ঈশ্বরের অস্তিত্বের উপলব্ধি ঘটে। এবং এই চেতনার উন্মেষ ঘটে যে ঈশ্বর ধর্মের উপরে। ধর্মের ওপর বিশ্বাস লোপ পায়। ধর্মের ভেদাভেদ মনকে আর নাড়া দেয় না। এই উপলব্ধি সম্পূর্ণ নিজস্ব সত্ত্বায় ঘটে। কাউকে দেখানোর জন্যে নয়।

৫) জাগরণের ফলে পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে এক আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। গাছপালা, প্রাণী সমূহকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করার বা জানার সামর্থ্য তৈরী হয়। যে সমস্ত প্রানী ও মানুষ তীব্র ব্যাথা ও দুর্ভোগে দিন যাপন করছে তাদের প্রতি এক বিশেষ সহানুভূতির উন্মেষ ঘটে। এবং পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে এক নতুন মেলবন্ধনের সুত্রপাত ঘটে। আবার এখান থেকে শত্রু বৃদ্ধি পায়। যে আধ্যাত্মিক এবং সাধক বা অবতার তার শত্রু থাকবেই। জাগরনে তার বৃদ্ধি খুব সাধারণ একটা ব্যাপার।।



৬) জাগরণের ফলে সংবেদনশীলতা অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। যা সাধারণ ভাবে কোন মানুষের থাকতে পারে না। এর সাথে জ্ঞান, অনুভূতি, মানে, অর্থ, চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তি, ইন্দ্রি়, চেতন, বোধ, বোধশক্তি, যৌক্তিকতা ও যৌন চেতনা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। যা কোন সাধারণ মানুষের কাছে অসম্ভব। শ্রবন ও দৃষ্টি শক্তির অদ্ভুত উন্নতি হয়। আধি ভৌতিক শব্দ, বিদেহী আত্মার চিৎকার, এবং অন্যান্য শব্দ কানে এসে পৌঁছয় যা একই স্থানে থেকে অন্যদের কাছে পৌঁছতে পারে না। ঘ্রাণ শক্তি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা কল্পনার অতিত। সমস্ত রকমের গন্ধের ঘ্রাণ পাওয়া যায় যা অন্য কেউ পায় না। এমনকি কোনো দুরের মানুষ বা বস্তুরও ঘ্রাণ পাওয়া যায়। দৃষ্টি শক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটে। অনেকেই বেড়ালের মতো রাত্রে দেখার ক্ষমতা অর্জন করে।

এর সাথে আধ্যাত্মিক অনুভূতিগুলো জাগ্রত হয়। যেমন স্বজ্ঞা, প্রেরণা, আবেগ, কল্পনা, এবং বিশ্বাস।
স্বজ্ঞা জীবনকে পরিচালনা করতে শুরু করে। এবং জাগরুক ব্যাক্তি স্বজ্ঞার পরিচালনায় জীবন অতিবাহিত করে।

৭) ভোর রাত্রে ৩ – ৪ টার মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে যায় কারণ তখন আত্মা সব থেকে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাত্রে বহু বার নিদ্রার ব্যাঘাত হয় বা ঘুম ভেঙ্গে যায়। সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর একটা বিষাদ ও ক্লান্তি অনুভূত হয়, যা স্বাভাবিক। দৈনিক ঘুমের সময় অস্বাভাবিক রকমের কমে যায় বা হ্রাস পায়।



৮) অবস্থার পরিবর্তন যেমন গৃহহীন হওয়া বা কর্মচ্যুত হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। অর্থের প্রাচুর্য দূরের বিষয়, নুন্যতম অর্থের যোগান সুনিশ্চিত হয় মাত্র। যা নশ্বর এই শরীরকে আড়ম্বর হীন ভাবে বাঁচিয়ে রাখে। এমনকি জাগরুক ব্যাক্তির ভবিষ্যতের চিন্তা লোপ পায়। সে এক অদ্ভুত আত্ম সন্তুষ্টিতে ভোগে। যা দেখে তার পরিবার ও পরিজনেরা বিচলিত হয়। এই জাগৃতি জোর করে সন্ন্যাসী বানিয়ে দেয়। এমনকি এমন অবস্থা সৃষ্টি করে যেখানে স্বপাক (নিজের রান্না নিজেকে করতে হয়) খাওয়া অনিবার্য হয়ে পরে। কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে দেয় না। কারোর প্রতি দুর্বলতা থাকলেও, এমন সমস্ত ঘটনা অলৌকিক ভাবে ঘটানো হয় যাতে কোন মতেই কোন প্রকার সম্পর্ক বিশেষত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারে। আর একরকম উদ্বেগ সবসময় কাজ করে। এর কারন অবশ্যই অজানা পথের দরজা খুলে যাওয়ার কারণে হয়।

এই সময় হলো গুরুর কাছে পৌঁছনোর সময়। কারন একজন গুরু সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। যাদের এই রকম অনুভূতি হচ্ছে তাদের উচিত ধ্যান করতে শেখা, কারণ ধ্যানেই এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসে। এটি আধ্যাত্মিক পথে যাত্রার প্রথম দরজা। এরপর আসবে আধ্যাত্মিক জীবনের ডাক। এই সময়ে গুরুর শরণাপন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি আধ্যাত্মিকতা শিখিয়ে নেবেন।

—-
ঈশ্বর দর্শন, ঈশ্বরের রহস্য, সন্ন্যাস, আত্মা জাগরন, আত্মা, আধ্যাত্মিকতা, সাধনা, সিদ্ধি, সম্পর্কে বুঝতে ও জানতে এই ব্লগটি (blog) অনুসরণ (follow) বা লাইক করুন। এই প্রবন্ধ শেয়ার করে মানুষের মধ্যে ঈশ্বর সচেতনতা বৃদ্ধি করুন। ঈশ্বরের পথেই মিলবে মুক্তি। আর আমাদের গ্রাহক হয়ে আধ্যাত্মিকতা শিখুন।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply