শক্তিপীঠ কঙ্কালীতলা । Kankalitala Shaktipeeth



Kankalitala Shaktipeeth

কঙ্কালীতলা হলো পশ্চিম বঙ্গের বীরভূম জেলায় অবস্থিত একটি অন্যতম শক্তিপীঠ বা সতীপীঠ। শক্তিপীঠ হিন্দুধর্মের পবিত্রতম তীর্থস্থান গুলির অন্যতম। লোকবিশ্বাস অনুসারে, শক্তিপীঠ নামাঙ্কিত তীর্থস্থান গুলিতে (দক্ষের কন্যা) দেবী দাক্ষায়ণী সতীর দেহের নানান অঙ্গ প্রস্তরীভূত অবস্থায় রক্ষিত আছে। সাধারণত ৫১টি শক্তিপীঠের কথা বলা হয়ে থাকলেও, শাস্ত্রভেদে পীঠের সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। পীঠনির্ণয় তন্ত্র গ্রন্থে শক্তিপীঠের সংখ্যা ৫১।

তন্ত্রচূড়ামণিতে একান্নপীঠের তালিকায় কাঞ্চী নামের জায়গাকে আঠাশতম সতীপীঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কঙ্কালীতলা আজকের সময়ের নাম। প্রাচীন তীর্থ হিসেবে এর  নাম ছিল কাঞ্চীদেশ। এখানে দেবী হলেন দেবগর্ভা। তাঁর ভৈরব হলেন রুরু। 

পীঠ নির্ণয়তন্ত্র অনুসারে, এখানে সতীর অস্থি বা কঙ্কাল পড়েছিল। সেই কারণে পীঠের নাম হয় কঙ্কালীতলা। আবার অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন, এখানে সতীর কটিদেশ বা কোমরের অংশ পড়েছিল।

“কাঞ্চীদেশে পড়িল কাঁকলি অভিরাম

বেদগর্ভা দেবতা ভৈরব রুরু নাম।।”

এখনকার বোলপুরের প্রাচীন নাম ছিল কাঞ্চীনগর। পীঠনির্ণয়তন্ত্র অনুযায়ী আঠাশতম এবং শিবচরিতে উল্লিখিত সপ্তত্রিংশৎ অর্থাৎ সাঁইত্রিশতম শক্তিপীঠ এই কঙ্কালীতলা। দেবীর নাম এখানে দেবগর্ভা(মতান্তরে বেদগর্ভা) এবং তাঁর ভৈরব মহাদেব রুরু।

“কাঞ্চীদেশে চ কঙ্কাল ভৈরবো রুরু নামকঃ

দেবতা দেবগর্ভাখ্যা।।”

এই কাঞ্চীর সঙ্গে কিন্তু দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চীপুরমের কোনো সম্পর্ক নেই। ইতিহাস থেকে জানা যায় পালযুগে এই অঞ্চলে কাঞ্চীরাজ রাজেন্দ্র চোল সেনাশিবির স্থাপন করেছিলেন। তখন থেকেই এই স্থানের নাম কাঞ্চীনগর হয়েছে।

গুপ্ত তন্ত্র সাধনার জন্য প্রসিদ্ধ কঙ্কালীতলা। এখানে আগে কোন মন্দির ছিল না। বদলে একটি জলাশয় বা কুণ্ড ছিল। শক্তিপীঠে এই কুণ্ডকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে দেবী মাহাত্ম্য। লোকশ্রুতি, কুণ্ডের মধ্যে কয়েকটি প্রস্থর খণ্ড আছে, যেগুলিকে সাধকরা দেবীর দেহের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ওই প্রস্থর খণ্ডগুলি কুড়ি আবার অনেকে বলেন বারো বছর অন্তর কুণ্ড থেকে তোলা হয়। পুজোর পর সেগুলিকে পুনরায় কুণ্ডের জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

কঙ্কালীপীঠের মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। রয়েছে শ্মশানকালীর বেশ বড় একটি বাঁধানো ছবি।  দেবগর্ভার উদ্দেশ্যে এই ছবিতেই নিত্যপুজো হয়। 

সতীকুণ্ডে শায়িত মহাদেবীর রক্ষকের ভূমিকায় বিরাজ করছেন কঙ্কালী পীঠের ত্র্যম্বক। পীঠভূমির প্রাঙ্গনে যে বটগাছ রয়েছে, তার শীতল ছায়ায় রুরু ভৈরবনাথের মন্দির।

মায়ের মন্দিরে ভোগের ব্যবস্থা রয়েছে। মন্দির কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে দক্ষিনা বিনিময়ের মাধ্যমে ভোগের কুপন পাওয়া যায়।

মন্দিরের দর্শনের সময়: সকাল 6 টা থেকে রাত্রি 8 টা। তখনই পূজা দেওয়া যায়।

কঙ্কালীতলা কোথায় অবস্থিত?

এটি বীরভূম ডিস্ট্রিক্টে বোলপুর লাভপুর রোডের উপর অবস্থিত (পিনকোড: 731204)।

কি ভাবে যাবেন কঙ্কালীতলা?

বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ী করে যাওয়া যায়। বোলপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে 10km দূরে অবস্থিত। এছাড়া শিয়ালদহ ও হাওড়া রেল স্টেশন থেকে বোলপুর / প্রান্তিকগামী অসংখ্য ট্রেন রয়েছে রয়েছে। বোলপুর ষ্টেশন থেকে মায়ের মন্দিরের দূরত্ব ৯ কিলোমিটার আর প্রান্তিক ষ্টেশন থেকে ৬ কিলোমিটার। আর ষ্টেশন থেকে টোটো এবং গাড়ী ভাড়া পাওয়া যায়। এছাড়া যদি কোন হোটেলে বা গেস্ট হাউসে থাকেন, সেখান থেকেও গাড়ী ভাড়া করা যায়। নিচের ম্যাপে বোলপুর থেকে NH 114 দিয়ে, তারপর, বোলপুর লাভপুর রোড দিয়ে কঙ্কালীতলার দূরত্ব 8km। যেতে সময় লাগে 22 মিনিট।

অন্য রাজ্য বা বিদেশ থেকে আসতে চাইলে প্লেনে করে কলকাতা বা সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট নামতে হবে। এখান থেকে কঙ্কালীতলার দূরত্ব 153km। এরপর গাড়ী ভাড়া করে অথবা হাওড়া অথবা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে করে যাওয়া যায়।

কখন যাবেন?

সারা বছরই যাওয়া যায়। তবে এখানে হোলি, সারদ পূর্ণিমা, দীপাবলী, মকর সংক্রান্তি, শিবরাত্রি, নবরাত্রি, দশেরা প্রভৃতি হলো উল্লেখযোগ্য উৎসব। কঙ্কালীতলায় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত হলো সব থেকে ভালো সময়। কারন এই সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকে।

আশেপাশের দ্রষ্টব্য স্থান:

সোনাঝুরির শনিবারের হাঠ

তাঁরাপীঠ

খোয়াই গার্ডেন

আমার কুটির

বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় 

শ্রীজনি শিল্প গ্রাম

ছাতিম তলা

রবীন্দ্র ভবন

গীতাঞ্জলি সিনেমা হল

শনিবারের হাট খোয়াই

শায়র বিথী পার্ক

বল্লভপুর ওয়াইল্ড লাইফ অভয়ারণ্য 

প্রকৃতি ভবন

সঙ্গীত ভবন

সোনাঝুরি ফরেস্ট

কলা ভবন

পাঠ ভবন

বিদ্যা ভবন

তানজিল ইনডিয়া 

সুরুল রাজবাড়ী

উত্তরায়ন

ইছাই ঘোষের দেউল

কোথায় থাকবেন?

কঙ্কালীতলায় সেভাবে কোন থাকার জায়গা নেই। বোলপুর থেকে মাত্র 10 km দূরত্ব। তাই সবাই বোলপুর শান্তিনিকেতনে থাকেন। সেখানে অজস্র হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে।

কঙ্কালীতলা ভ্রমন

কলকাতা থেকে কঙ্কালীতলা ভ্রমন করা যায়। দুই রাত তিন দিন বা এক রাত দুই দিন এর প্যাকেজ ট্যুরে বোলপুর ও কঙ্কালীতলা দুই স্থান মোটামুটি ভালো ভাবে ঘুরে নেওয়া যায়। আবার কঙ্কালীতলার সাথে বাকি শক্তিপীঠ গুলির দর্শন নিয়ে একটি প্যাকেজ ট্যুরে যাওয়া যেতে পারে। আবার দিনের দিন কলকাতা থেকে কঙ্কালীতলা ঘুরে আসা যায়।


আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।


আরো তীর্থস্থান সম্পর্কে জানুন