
আত্মার অস্তিত্ব আছে কি নেই? একথা বোঝা নিঃসন্দেহে খুবই শক্ত। আরো শক্ত এর অস্তিত্ব প্রমাণ করা। বিভিন্ন ধর্মে আত্মা সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে। সেরকম হিন্দু সনাতন ধর্মেও আত্মার বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। যা প্রথম জানা যায় ভগবত গীতায়।
শ্লোক -২০
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।। ২০ ।।
গীতায় আত্মার অমরত্ব সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে| বলা হয়েছে আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, আত্মা অমর| মানবদেহের জন্ম হয় এবং মৃত্যু হয়| মৃত্যু আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না| মৃত্যুতে স্থূল দেহের বিনাশ হয় মাত্র| বস্ত্র জীর্ণ হলে তা পরিত্যাগ করে যেমন আমরা নূতন বস্ত্র পরিধান করি তেমনি আত্মা জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নূতন দেহ গ্রহণ করে| মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম হয় অর্থাৎ পুনর্জন্ম হল দেহান্তর মাত্র| শৈশব, বাল্য, যৌবন ও জরার ন্যায় মৃত্যুও দেহের একটি অবস্থা মাত্র| আত্মাকে মৃত্যু বিনাশ করতে পারে না, অস্ত্র ছেদন করতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করতে পারে না, জল সিক্ত করতে পারে এবং বায়ু শুষ্ক করতে পারে না|
কিন্তু কোথাও কিছু বলা থাকলেই মানতে হবে একথা ভুল। যতক্ষণ না নিজে যাচাই করছেন বা বুঝতে পারছেন তার আগে অবশ্যই একথা মানবেন না।
আর দ্বিতীয় বিষয় হলো জন্মান্তরবাদ বা পুনর্জন্ম।সত্যি কি পুনর্জন্ম হয়? কিন্তু কি ভাবে জানা যাবে যে হয়? এখন বিজ্ঞানের যুগ। মানুষ অনেক আগেই চাঁদে অবতরন করেছে। মহাকাশের রহস্য উপলব্ধি করতে চেষ্টা করছে। মোবাইল ফোন বানিয়ে একটা আস্ত জগৎ বানিয়ে ফেলেছে। সে এখন নির্দিষ্ট প্রমাণ ও উদাহরন ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করে না।
জন্মান্তরবাদ বলে যে আত্মা বার বার ফিরে আসে নতুন শরীরে তার নিজের কর্মের ঋণ চোকাতে বা শোধ করতে। শরীর বিভিন্ন কিন্তু আত্মা এক এবং অমর। অনেকটা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পোষাক পরিবর্তন করার মতো। সত্যি কি আত্মা অমর? আধুনিক বিজ্ঞান আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। কারন ঐ একই, অর্থাৎ আত্মার অস্তিত্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারোর মুখের কথাতো প্রমাণ হতে পারে না। আত্মার প্রমাণ না পাওয়া গেলে মানুষেরও ঈশ্বরের উপর ভরসা কমে যাবে। তখন ঈশ্বরের অস্তিত্বের সংকট হবে।
কিন্তু ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই আত্মার প্রমাণ রেখেছেন। যা শুধু যোগীরা উপলব্ধি করতে পারেন বহু জন্মের পুণ্যের সুফলে। কিন্তু সবাই তো আর যোগী নন। তবে সাধারণ মানুষ কি উপায়ে আত্মার অস্তিত্ব মেনে নেবেন? ঈশ্বর তারো উপায় রেখেছেন। এবং সঠিক সময়ে তিনি সেই উপায় বা উদাহরণ দেখিয়ে প্রমাণ করে দেবেন আত্মার অস্তিত্ব ও জন্মান্তরবাদ। এবং মানুষ পুনরায় ঈশ্বরের পথ অনুসরণ করবেন। এই দুনিয়ায় কোনো কিছুই এমনি এমনি হয় না। একটা গাছের পাতাও এমনি এমনি নড়ে না।

আসলে জন্মান্তরবাদ ও আত্মা একে অপরের পরিপূরক। সুতরাং জন্মান্তরবাদকে প্রমাণ করতে পারলে আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে। এখনও বহু মানুষ এই দুটি প্রশ্ন মাঝে মাঝে করে থাকেন। এই জন্মান্তরবাদ একটি তত্ত্ব যা এতদিন প্রমান করা যায় নি। তার কারণ তখনও উপযুক্ত সময় আসে নি। যদিও তার প্রমাণ বহু আগে থেকেই ঈশ্বর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যারা ঈশ্বর বিশ্বাসী তারা জানেন যে ঈশ্বর তার ভক্তদের সমস্ত ক্ষেত্রেই রক্ষা করবেন তা সে বিপদ হোক বা তত্ত্ব।
জন্মান্তরবাদ প্রমাণ করতে হলে সেই সমস্ত ব্যক্তির জীবনে ঝুঁকতে হবে যারা তাদের আগের জীবনের কথা বলেছেন এবং তা পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত। আজ এখানে এরকম দুই জনের গল্প বলবো যারা তাদের পূর্ব জন্মের গল্প বলেছিলেন। এবং তা প্রমানিত হয়েছে রীতিমত পরীক্ষার দ্বারা। এবং এই দুটি ঘটনার সাথে জড়িয়ে রয়েছেন দুইজন সনামধন্য ব্যক্তিত্ব বা মনীষী যাদের চেনেন না এমন মানুষ বিরল বা খুব অল্প।
প্রথম গল্পটা ফাদার অফ নেশন, মহাত্মা গান্ধীর। গান্ধী একবার শুনতে পেলেন শান্তি দেবী নামে দিল্লি শহরের ছয় বছরের এক বালিকার কথা। যে দাবি করেছিল যে সে পূর্ব জন্মে মথুরা শহরে থাকতো। এবং তখন তাঁর নাম ছিল লুগডি দেবী। ঐ শিশুটি চার বছর বয়স থেকে বলতে থাকে যে, সে মথুরাতে থাকতো। এবং তাঁর স্বামীর নাম ছিল কেদারনাথ। সেই মহিলাটির একটি সন্তান প্রসব করার অল্প দিনের মধ্যে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
শান্তি দেবীর স্কুলের হেড মাস্টার মথুরাতে কেদারনাথ বলে একজন বস্ত্র ব্যবসায়ীর খোঁজ পান। যার স্ত্রী লুগডি দেবী নয় বছর আগে এক পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরন করেন। সেই মহিলা মারা যাওয়ার দশ দিন পূর্বে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেছিলেন। হেড মাস্টার মহাশয় কেদারনাথ ও ঐ পুত্র সন্তানটিকে সাথে করে নিয়ে শান্তি দেবীর বাড়িতে যান। এবং কেদারনাথকে নিজের ভাই বলে পরিচয় দেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই ছিল যে, শান্তি দেবী কেদারনাথকে তাঁর পূর্ব জন্মের স্বামী বলে এবং ঐ পুত্র সন্তানটিকে তার সদ্য প্রসব হওয়া পূর্ব জন্মের সন্তান হিসেবে চিহ্নিত করেন।
মহাত্মা গান্ধী এই শান্তি দেবী সম্পর্কে জানতে পারেন। এবং নিজের কাছে নিয়ে এসে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সেই তদন্ত কমিটি শান্তি দেবীকে তদন্তের স্বার্থে তাঁর বর্নিত পূর্ব জন্মের স্বামী কেদারনাথের বাড়িতে নিয়ে যায়। তারিখটা ছিল ১৫ই নভেম্বর ১৯৩৫।
শান্তি দেবী কেদারনাথের বাড়িতে গিয়ে সেখানে একাধিক পরিবার সদস্যদের ও লুগডি দেবীর ঠাকুরদা বা প্রপিতামহকে চিহ্নিত করেন। এবং এমন এক গোপনীয় তথ্য পরিবেশন করেন যা কেবলমাত্র কেদারনাথ ও লুগডি দেবী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যাক্তি জানতো না। এই সমস্ত প্রমাণ পাওয়ার পর তদন্ত কমিশন শান্তি দেবীকে লুগডি দেবীর পরজন্ম বা পুনর্জন্ম বা জন্মান্তর বলে স্বীকৃতি দেন।
এরপরের ঘটনাটির সাথে জড়িয়ে রয়েছেন বিশ্ববরেন্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। এই ঘটনাতে করদ রাজ্য ভরতপুরের সেলিমপুরে প্রভু নামে সাড়ে তিন বছর বয়সের এক বালকের পূর্ব জন্মের কথা মনে পড়ে যায়। প্রভু বলেছিলো যে বিগত জন্মে সে ছিল গুরবক্স নামে এক ব্রাহ্মাণ পুরোহিত। এবং সে হাতোরী নামক এক গ্রামে যেটি একটা দুর্গের মধ্যে অবস্থিত, গ্রামের জমিদারের কাছে কাজ করতো। সে ওখানে তাঁর পরিবারের সদস্য ও ভাইদের কথা বলেছিল।
প্রভুর কথা জানতে পেরে ভরতপুর এস্টেটের তখনকার মহারাজা কিষান সিং, তাকে ডেকে পাঠালেন তাঁর প্রাসাদে। প্রাসাদে মহারাজ প্রভুর সাথে কথা বলে নিশ্চিত হলেন। এরপর রায় বাহাদুর শ্যামসুন্দর লালের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। প্রভু জানায় যে সে গত জন্মে তার হাভেলি অর্থাৎ বাড়ির সামনের জমিতে পাঁচটি পুরনো মোহর লুকিয়ে রেখেছিলো। সেই মোহর ঐ তদন্ত কমিটির লোকজন প্রভুর নির্দেশিত স্থান থেকে খুঁড়ে বার করে।
ডক্টর হেমেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি একজন প্যারাসাইকোলজিস্ট যিনি যোধপুরের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা পত্রিকা রচনা করেন, এই প্রভু কে নিয়ে। এই হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন কলকাতার প্যারাসাইকোলজিক্যাল সোসাইটির ফাউন্ডেশন মেম্বার বা সদস্য। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন। যেমন সনামধন্য অভিনেতা উত্তম কুমার আর বিশ্ববরেন্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায় এই হেমেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির গবেষণা পত্রিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখেন এক কালজয়ী শিশু সাহিত্য ‘সোনার কেল্লা’ যা পরে চলচ্চিত্রে রুপান্তরিত হয়।
এরাকম হাজার হাজার ঘটনা রয়েছে যা কেবলমাত্র দুটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। তা হল আত্মার অস্তিত্ব ও জন্মান্তরবাদ। বিজ্ঞান কাকে স্বীকৃতি দেয়? যাকে পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করা যায়। আজ এই দুটি ঘটনা দিয়ে এই আত্মা ও জন্মান্তরবাদের প্রমাণ আশা করি প্রতিষ্ঠা পাবে।
দুটি ঘটনাতেই দেখা গেল যে দুটি আত্মা এক জন্মের পরে পরবর্তী জন্মে গেছে। এবং তারা তাদের পূর্ব জন্মের স্মৃতি মনে রাখতে পেরেছিল। যা বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত ব্যক্তি বর্গের সম্মুখে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। এর থেকে এই সত্যি প্রকাশ পায় যে আত্মার অস্তিত্ব আছে। এবং আত্মা বারংবার জন্ম নেয় তার কর্মের ঋণ শোধ করতে। সুতরাং জন্মান্তরবাদ বা পুনর্জন্মও সত্য।
——
ঈশ্বর, ব্রহ্মান্ড, ঈশ্বরের দর্শন ও রহস্য জানতে এই ব্লগট অনুসরণ (follow) করুন। ঈশ্বরের নির্দেশিত পথেই মিলবে মুক্তি। ভালো লাগলে প্রবন্ধটি শেয়ার করে সমস্ত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিন।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

