থিম পুজো কি দূর্গা পুজোর অবমাননা?

বিভিন্ন স্থানে দুর্গার বিভিন্ন রুপ নিয়ে মানুষের সমালোচনা শুরু হয়েছে। যদি সত্যি তা হয়ে থাকে তবে তা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু এই বিষয়ে কোন শীল মোহর দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন দুর্গার কোন শাস্ত্র সম্মত রুপ ছিল কিনা? আর যদি না থেকে থাকে তবে চেহারার রুপান্তর কি ভাবে ঘটেছে।

দেবী দুর্গাকে কি কেউ চাক্ষুষ দর্শন করেছে? দেবীর যে রুপ আমারা সবাই দেখি তা এক প্রকার ভাবনার ফসল। অর্থাৎ যুগে যুগে দেবীর এই রুপ গড়ে তোলা হয়েছে। এবং কে সেই রুপ ফুটিয়ে তুলেছে? অবশ্যই মানুষের তৈরী সমাজ ব্যবস্থা।

এখন দেখে নেওয়া যাক এই বিবর্তন ঠিক কি ভাবে হয়েছে।

মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) দশেরা নামে দুর্গাপূজা প্রচলন করেছিল। নেপালে দশেরা বা দাশেহিন নামে দুর্গা পূজা হয়।

ভারতের দুর্গামূর্তিগুলির সবচেয়ে পুরানো নিদর্শনগুলি ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতে খৃস্টের আগে ও পরের একশো বছরের মধ্যবর্তী সময়ের, এবং ওই সময়কাল নাগাদই এ দেশে মহিষমর্দিনী সংক্রান্ত ধর্মবিশ্বাসের প্রচলন হয়েছিল বলে মনে করা যেতে পারে।

নবম-দশম থেকে দ্বাদশ শতকের প্রাপ্ত কিছু মূর্তিতে অবশ্য দেবী গৌরী বা চণ্ডীকে লক্ষ্মী-সরস্বতীর সঙ্গে, কোথাও বা গণেশ-কার্ত্তিকের সঙ্গে দেখানো হয়েছে, যেমন ওড়িশায় প্রাপ্ত একাদশ শতকের একটি মূর্তিতে। আবার কোনার্কে প্রাপ্ত একটি মূর্তিতে দেবীর দু’ পাশে জগন্নাথ ও শিবলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে। রাজস্থানের পিপলায় প্রাপ্ত এক দেবীমূর্তিতে দেবীর দু’ পাশে দেখা যায় কুবের ও গণপতিকে। কলকাতা জাদুঘরে সংগৃহীত একটি মূর্তিতে সিংহবাহিনী দেবীর কোলে একটি শিশুকে দেখা যায়।

প্রাচীন মহিষমর্দিনী ভাস্কর্য খ্রিষ্ট পূর্ব প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের। যেগুলো পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে একটি এলাহাবাদের কাছে ভিটাগ্রামে, অন্য কয়েকটি মথুরায়। মথুরার সংখে খনন করে পাওয়া একটি মূর্তিতে দেখা যায়, দেবী একটি পশুর গলার কাছে হাত রেখেছেন।

এই সব প্রাচীন ভাস্কর্যগুলির বেশির ভাগ নিদর্শনেই দেখা যায়, দেবী বিনা অস্ত্রেই (খালি হাতে) এক হাতে একটি মহিষের গলা টিপে বা জিভ টেনে ধরেছেন ও অন্য হাতে তার পৃষ্ঠদেশ মর্দন করছেন।

কুষাণ যুগের একটি মূর্তিতে ত্রিশূলও দেখানো হয়েছে। গুপ্তযুগের কিছু মূর্তিতে দেবীকে অসুরের দেহে শূলবিদ্ধ করতে দেখা যায়। ভিটা ও মথুরার মূর্তিতে দেখা যায়, চতুর্ভুজা দেবীর পদতলে শূলবিদ্ধ মহিষ, তার লেজ দেবী এক হাতে আকর্ষণ করছেন, বাকি তিন হাতে অস্ত্র।

অনুরূপ অস্ত্রধারিনী মহিষঘাতিনী দেবীর মূর্তি পাওয়া যায় পশ্চিম ভারতের বাদামি গুহায় ও ইলোরা গুহায়, ওড়িশার উদয়গিরি ও হিমাচল প্রদেশের চাম্বায়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে দেবী এখানে চতুর্ভুজা, দশভূজা নয়। আরো একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে মনুষ্যদেহধারী কোনো অসুর নেই এবং সবগুলিতেই সিংহ অনুপস্থিত। আবার পাল যুগের কিছু মূর্তিতে দেবীকে ষোড়শোভূজা এবং অষ্টাদশ ভূজায় দেখা গিয়েছে। সুতরাং এখনকার দশভূজা কোন সাবেকি ঘরানা নয়।

গ্রীক রণদেবী অ্যাথিনার দেবাসুর সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার যে দৃশ্য তুরস্কের পার্গমেনের বেদীর ভিত্তিতে দ্বিতীয় খ্রিস্ট পূর্বাব্দে খোদিত হয়েছিল, সেখানে সিংহারূঢ়া দেবীর ভঙ্গিমা অবিকল আমাদের দুর্গার মতো। এখানকার আর একটি মূর্তিতে দেখা যায়, দেবী অ্যাথিনা এক দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন আর তাঁর সহচর সিংহ।

একটি আসুরীয় সীলের ওপর খোদিত দেবী ইশতারকে অনেকটা দেবী দুর্গার মতোই সিংহের পিঠে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে দেখা যায়।

ভারতে দেবীর সাথে সিংহের আগমন প্রথম খৃস্টাব্দে। কারন হিসেবে ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্রনাথ বেশ কিছু স্বর্ণ মুদ্রা বা পদকে যেমন শক -পহ্লব রাজা প্রথম অজ-র কিছু মুদ্রায় শক্তিদেবীর সঙ্গে সিংহের মুখ খোদিত ও গুপ্ত আর কুষাণ রাজাদের নানা মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবীর উপস্থিতি দেখতে পান।

ভারতে সিংহ থাকলেও পশ্চিম ইউরোপের সিংহবাহিনী দেবী যে ভারতের দুর্গার সাথে সংমিশ্রিত হয়েছে একথা পরিস্কার। অথবা এও হতে পারে যে প্রাচীন পৃথিবীতে কোন সিংহবাহিনী দেবীর সাথে অসুরের দৈরথের কাহিনী ভারতে দুর্গা আর পশ্চিম ইউরোপে দেবী অ্যাথিনার উৎপত্তি ঘটিয়েছিল।

আস্তে আস্তে বাঙ্গালীর যৌথ পরিবারের রুপে দেবীকে বিকশিত করা শুরু হয়। লক্ষ্মী, সরস্বতী যে দেবীর কন্যা এ তথ্য পুরান বা শাস্ত্র কোথাও দেওয়া নেই। কিন্তু বাঙ্গালী মনে যে সামাজিক ছাপের প্রতিফলন পড়েছে তার ছোঁয়া দুর্গার মধ্যেও এসেছে। এবং তা একবার নয় বরং বারংবার তার পরিবর্তন ঘটেছে।

এই পরিবর্তনের বর্ননা মঙ্গলকাব্যগুলিতে আর খ্যাত অখ্যাত নানা রচয়িতার আগমনী গানে পাওয়া যায়। যেমন “দেখ না নয়নে গিরি গৌরী আমার সেজে এল/ দ্বিভুজা ছিল যে উমা দশভুজা কবে হল!/ সঙ্গে লক্ষ্মী সরস্বতী আর কার্তিক গণপতি/ সিংহপৃষ্ঠে ভগবতী চারিদিক করেছে আলো।“

পারিবারিক রুপের রুপান্তর দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকে হয়েছে বলে মনে করেন ডঃ সুকুমার সেন। ষোড়শ শতাব্দে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কবিকঙ্কণচন্ডীর একটি অংশ- যাতে আধুনিক কালে পূজিত দুর্গা মূর্তির পুরো চেহারাটি পাওয়া যায়ঃ-“……সিংহ পৃষ্ঠে আরোপিলা দক্ষিণ চরণ/মহিষের পৃষ্ঠে বাম পদ আরোপণ/ ……বাম করে মহিষাসুরের ধরি চুল/ ডানি করে বুকে তার আরোপিলা শূল।/ বামে শিখিবাহন দক্ষিণে লম্বোদর/ বৃষে আরোহণ শিব মস্তক উপর।/ দক্ষিণে জলধিসুতা বামে সরস্বতী/সম্মুখেতে দেবগণ করে নানা স্তুতি।।“ ইত্যাদি।

শুধু পরিবারের পরিবর্তন নয়, বদল আনা হয় দুর্গার মুখের গঠনেও। পুরনো প্রতিমায় যে ‘বাংলা চাল’-এর ঠাকুর আমরা দেখেছি, তার টানা চোখ, শুকপাখির মতো নাক। খাঁটি দেবীরূপকে বদলিয়ে তার মধ্যে খানিকটা ঘরের মেয়ে-বউয়ের টাচ নিয়ে আসেন পূর্ববঙ্গের রুদ্রপালরা। চোখের মণিতে অতিরিক্ত ঔজ্জ্বল্য এনে দেবীর মহিমা প্রকাশ করা হতে থাকে। চোখের পাতা সূক্ষ্ণ হয়, চেহারা ভারী করা হয়। মুখে গর্জন তেল প্রয়োগ করে চাকচিক্য আনা হয়।

১৯৪০ এ যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল বিপুল বদল আনেন প্রতিমার গড়নে। ঘরোয়া ভঙ্গিমা রুপান্তরিত হয় ‘যোদ্ধা ঠাকুরে’। এমনকি চালচিত্র ভেঙে কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী— সকলকেই রণভঙ্গিমা প্রদান করা হয়। অসুর বদলে হিটালারি গোঁফওয়ালা অসুর সেইসময়ের বাংলায় আকছার দেখা গিয়েছে।

১৯৭০ এর পর ফিল্মি তারকাদের মুখের আদলে শুরু হয় প্রতিমার মুখ তৈরি। এই নতুন ফর্মের নাম হয় ‘ছবিয়ানা’। এই সময় অসুর ম্যাসল ম্যানে পরিবর্তিত হয়।

১৯৭৫ এ এক নতুন চালের সূচনা হয়, যখন কুমারটুলির থেকে প্রতিমা নির্মাণ এসে পড়ে নামী শিল্পীদের হাতে। নীরদ মজুমদার, বিকাশ ভট্টাচার্য, ইশা মহম্মদ, শানু লাহিড়ি, মীরা মুখোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে একেবারেই অন্য ‘চাল’ উঠে আসে।

থিম ব্যবহারটা দুর্গা প্রতিমাতে নতুন কোন ব্যাপার নয় এবং দুর্গার শাস্ত্র সম্মত কোন রুপ কোনদিনই ছিল না। পরিবর্তনশীল সমাজের চাপে রুপের বদল ঘটেছে সেই প্রাচীন কাল থেকে। এই রুপান্তরটাই হলো থিম।

ফলে যারা এই থিমের বিরুদ্ধে গিয়ে হাওয়া গরম করছে তারা একটু পড়াশোনা করুন। মানুষের পুজো মানুষের সমাজের বদলের সাথে বদলায়, এবং এটাই স্বাভাবিক। এর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই।

এই প্রবন্ধটির সাথে প্রামাণ্য চিত্র দেওয়া হলো।

প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন। আর আমাদের ব্লগটি অনুসরণ বা Follow করুন।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply