
এমন একটা ব্যাপার যা অল্প বিস্তর সকলের আছে। এমনকি খুব ছোট শিশুদেরও থাকে। আবার ঈশ্বরের বা দেবতাদেরও থাকে। কাউকেই এর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, এটা বলা যাবে না। আর সেটা হল ক্রোধ।
ক্রোধ হলো এক রকম অনুভূতির বিশৃঙ্খলা। এর জন্যে আমাদের অনেক কিছুই যেমন ঘর, সম্পর্ক, সমাজ, ভবিষ্যত, স্বাস্থ্য প্রভৃতি নষ্ট হতে পারে বা হয়ে থাকে।
বজ্রযোগিনী তন্ত্রে বজ্রবরাহী হলো কৃষ্ণা ক্রোধিনী অর্থাৎ ক্রোধান্বিত কালী। কালীর ক্রোধ শুধুমাত্র অনুভূতির বিশৃঙ্খলা নয় বরং একটা শক্তি। এটা না থাকলে কালী অসুর বধ করতে পারত না।
আবার, পুরানে শিবের ক্রোধের কাহিনীর একেবারে ছড়াছড়ি। যেমন দক্ষ যজ্ঞ পর্বে সতীর শব নিয়ে ক্রোধে তান্ডব নৃত্য। ধ্যানরত শিবের ধ্যান ভাঙ্গার জন্য মদনদেবের দহন হয়, পার্বতীর সাথে মিলন পর্বে। আর, একবার ক্রোধে ব্রহ্মাকেও শাপ দিয়েছেন।
এমনকি শিবের ক্রোধের কারনেই কাল ভৈরবের সৃষ্টি হয়েছিল। যখন শিব দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে, তখন ব্রহ্মা শিবকে তিরস্কার করতে শুরু করে। এবং এর কারনে ক্রোধান্বিত শিব থেকে কাল ভৈরবের উৎপত্তি হয়।
পদ্ম পুরান অনুসারে দুর্গার বাহন সিংহের সৃষ্টি হয়েছিল দুর্গার ক্রোধ থেকেই। বিভিন্ন দেব দেবীরা সকলেই ক্রোধান্বিত হতেন, পুরানে এর অজস্র প্রমাণ রয়েছে।
মুনি ঋষিদের ক্রোধের গল্প তো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ক্রোধের জন্য বিখ্যাত হলো দুর্বাসা, তিনি সবসময়ই ক্রোধান্বিত থাকতেন আর অভিসম্পাত করতেন।
ঋষি জমদগ্নির গল্প হয়তো কারোর অজানা নেই। স্ত্রী রেনুকার পদস্খলনের কারনে ক্রোধান্বিত জমদগ্নি তার মস্তক খন্ডন করতে বলেন। পঞ্চ পুত্র কথা না শুনে অভিশাপে প্রস্তরিভুত হয়। তখন কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরাম পিতৃ আদেশ পালন করেন।
তবে দেবতা ও ঈশ্বরের বা ঋষিদের ক্রোধ আছে বলে এটা যে খুব ভালো অনুভূতি তা কিন্তু একদমই নয়। এবং এই জন্য ক্রোধকে প্রধান ছয় শত্রু বা রিপুর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ছয় ত্রুটি বা রিপু হলো কাম, ক্রোধ,লোভ, মোহ, মদ‚ মাৎসর্য।
আমাদের অনেকেই ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে আনতে সচেষ্ট হই। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফলতা অর্জন করি না। সাধারণ মানুষের পক্ষে ক্রোধ সংবরন করা খুব কঠিন।
ক্রোধে যেটা সবচেয়ে বেশি হয় সেটা হলো শরীরের ভিতরের ক্ষতি। যা বাইরে থেকে সচরাচর দেখা বা বোঝা যায় না। এর ফলে মানুষের সব থেকে বেশি যে সমস্যা তৈরি হয় তা হলো আয়ু হ্রাস পাওয়া।
কেন ক্রোধ হয়?
আগেই বলেছি যে ক্রোধ হলো অনুভূতির বিশৃঙ্খলা। যখন আমরা আক্রান্ত হই বা আমাদের ভাবনাকে বা ইচ্ছেকে আঘাত করা হয়। বা, একটা অস্বস্তি বোধের সৃষ্টি হয় যখন কেউ আমাদের মানসিক ভাবে চাপ দেয় বা আঘাত করে বা কারুর কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পাই বা কেউ যখন আমাদের লক্ষ্য মাত্রাকে আটকে দেয় বা বিঘ্নিত করে, তখনই ক্রোধ বা রাগের উৎপত্তি হয়।
এছাড়া আরো অনেক কিছুর কারনে ক্রোধের উৎপত্তি হতে পারে। ক্রোধের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন ক্রোধের কখন কখন উদ্রেক হবে? বা, তার তীব্রতা কেমন হবে? বা তা কতক্ষণ বহাল থাকবে? তার কোন গড় পড়তা হিসেব হয় না।
ক্রোধ মানুষকে একটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে উদ্যোগী করে তোলে এবং ফলশ্রুতিতে একটা ঝগড়া, বাক বিতন্ডা এমনকি এক প্রকার হিংস্রতার সৃষ্টি হয়। ফলে ক্রোধান্বিত ব্যক্তি সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এর ফলে দৈহিক স্বাস্থ্যের উপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়, যেটা সব সময় গোচরে আসে না। এর মধ্যে রক্ত চাপ বৃদ্ধি অন্যতম। এছাড়া মস্তিষ্কের স্ট্রেস হরমোন গুলির ক্ষরন হঠাৎ করে বেড়ে যায়। এর ফলে সিমপ্যাথিটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ক্রোধের নিয়ন্ত্রণ
কি ভাবে বা উপায়ে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। এর উত্তর দেবতা এবং মুনি ঋষিদের দৈনন্দিন জীবনের কাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। এদের ক্রোধ বা রাগ হয় কিন্তু এরা কোনরকম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বা হতেন না। আর তার কারন অবশ্যই ধ্যান যোগ। এবং ধ্যানই একমাত্র প্রাকৃতিক উপায়, যেখানে ক্রোধ বা রাগকে সম্পূর্ণ রূপে সারিয়ে তোলা সম্ভব।
এবিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ফল কনসাসনেস এন্ড কোগনিশন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। একবার মাত্র ধ্যানের ফলেই ক্রোধ বা রাগের প্রতি প্রতিক্রিয়া কমিয়ে আনা সম্ভব।
যারা ক্রোধের শিকার এবং একবারের জন্যেও ধ্যান করেনি। তাদের হার্ট রেট, রক্ত চাপ এমনকি শ্বাস প্রশ্বাসের রেট সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি থাকে। দেখা গেছে মাত্র কুড়ি মিনিটের ধ্যান তাদের এতোটাই পাল্টে দেয় যে, ক্রোধ হলেও তারা আগের থেকে অনেক বেশি শান্ত থাকে এবং ক্রোধের প্রতি তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া অনেক কমে যায়।
ধ্যান একটা অভ্যন্তরীণ শান্তির পরিস্থিতি বা পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং এক প্রকার সান্ত্বনার অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয় যেখানে ক্রোধান্বিত ব্যাক্তি নিজেকে সন্তুষ্ট বলে মনে করে।
ফলে ক্রোধান্বিত ব্যাক্তি নিজেকে পক্ষপাতদুষ্ট ভাবে ভাবতে পারে না। উল্টে যুক্তিসঙ্গত ভাবে অবস্থা বিচার করতে শুরু করে। ফলে অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ঐ ব্যক্তি আর উত্তেজিত বোধ করে না এমনকি সেভাবে প্রতিক্রিয়াও ব্যাক্ত করে না বরং যুক্তিগ্রাহ্য ভাবে সাড়া দেয়।
ধ্যান রোজ করা উচিত কারন ধ্যানেই ক্রোধ দমিয়ে ফেলা সম্ভব। আমাদের ধ্যান শেখার কোর্সে ক্রোধের অবসান ঘটে। শিখতে যোগাযোগ করতে পারেন।
এই প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের পেজটি লাইক দিয়ে অনুসরণ করুন এবং আপনার পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন ।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


