সতী পীঠের রচনা ও সম্ভাব্য ইতিহাস

সতী পীঠ সতীর ক্ষন্ডিত দেহাংশের উপর নির্মিত। এই সতী পীঠ হিন্দু ধর্মে বর্নিত তীর্থ স্থান। এর উদ্ভব সম্ভবত নবম, দশম শতকে হিন্দু ধর্মের উত্থানের সময়, বা শংকরাচার্যের সময়ও হতে পারে।

ঈশ্বর তো নিরাকার তার পত্নী সতীরও নিরাকার হওয়ার কথা। তবে যদি তারা মানব অবতারে থেকে থাকেন। তবে ধরে নিতে হবে সতীর দেহ ছিল। দেখা যাক পূরান কি বলছে? সতী দক্ষের কন্যা হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। অতএব মানব অবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

পৌরাণিক উপাখ্যান শাক্তপীঠের উদ্ভব প্রসঙ্গ মহাভারত-এর ‘দক্ষযজ্ঞ’ নামে একটি পুরাণ কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে।

সতী পিতার অমতে মহাদেবকে পতি রুপে গ্রহণ করেন। তার ফলে দক্ষ শিবকে অপমান করার চেষ্টায় যজ্ঞ শুরু করে। কিন্তু সেই যজ্ঞের আগুনে সতী আত্মঘাতী হন। এবং ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সতীর শরীর নিয়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। আসন্ন প্রলয়ের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবীর দেহ খন্ডিত করেন এবং খন্ডিত দেহাংশ পৃথিবীতে এসে পড়ে। যেগুলোতে গড়ে উঠেছে সতী পীঠ, যা হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ স্থান।

এখন যে সমস্ত স্থানে দেহাংশ পড়েছিল সেগুলো নিম্নে বর্নিত।

১। হিঙ্গুলা (হিংলাজ)— সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র, করাচি, পাকিস্তান।

২। করবীর/সর্করারে- দেবীর ত্রিনেত্র, করাচি, পাকিস্তান।

৩। সুগন্ধা- দেবীর নাসিকা, বরিশাল,বাংলাদেশ।

৪। অমরনাথ- সতীর কন্ঠ, শ্রীনগর।

৫। জ্বালামুখী- সতীর জিহ্বা, পাঠানকোট।

৬। জালন্ধর- সতীর বামস্তন, জালন্ধর, পঞ্জাব।

৭। বৈদ্যনাথ- সতীর হূদপিণ্ড, দেওঘর, ঝাড়খণ্ড।

৮। মানস- সতীর ডান হাত, মানস সরোবর।

৯। নেপাল- সতীর জানুদ্বয়, গুজ্যেশ্বরী মন্দির, নেপাল।

১০। উৎকল বিরজাক্ষেত্র- সতীর নাভী, পুরীর মন্দির চত্বরে।

১১। গণ্ডকী- সতীর গণ্ডদেশ, মুক্তিনাথ মন্দির, নেপাল।

১২। বহুলা- সতীর বাম বাহু, কেতুগ্রাম, বর্ধমান।

১৩। উজানী- দেবীর ডান কনুই, গুসকরা, বর্ধমান।

১৪। চট্রল/চট্রগ্রাম- সতীর ডান বাহু, চট্রগ্রাম, বাংলাদেশ।

১৫। ত্রিপুরা- সতীর ডান পা, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির, ত্রিপুরা।

১৬। ত্রিস্রোতা- সতীর বাম পা, জলপাইগুড়ি।

১৭। কামরূপ কামাক্ষা- সতীর যোনি, গুয়াহাটি।

১৮। যুগাদ্যা- সতীর ডান পাদাঙ্গুষ্ঠ, ক্ষীরগ্রাম, বর্ধমান।

১৯। কালিঘাট- সতীর ডান পাদাঙ্গুলি, কালিঘাট, কলকাতা।

২০। প্রয়াগ- দেবীর হাতের আঙুল, এলাহাবাদ।

২১। জয়ন্তী/জয়ন্তাতে- সতীর বাঁ জঙ্ঘা, শ্রীহট্র, বাংলাদেশ।

২২। কিরীট/কিরীটকোণা- সতীর কিরীট অঙ্গ, মুর্শিদাবাদ।

২৩। বারাণসী- দেবীর কর্ণ, বারাণসী।

২৪। কন্যাশ্রম- দেবীর পৃষ্ঠদেশ, তামিলনাডু।

২৫। কুরুক্ষেত্র- দেবীর গুল্ফ, হরিয়ানা।

২৬। মনিবেদ/মনিবেদিক- দেবীর মনিবদ্ধ, রাজস্থান।

২৭। শ্রীশৈল- দেবীর কর্ণকুণ্ডল, শ্রীহট্র, বাংলাদেশ।

২৮। কাঞ্চিদেশ- দেবীর কঙ্কাল, কঙ্কালীতলা, বোলপুর।

২৯। কালমাধব- দেবীর বাঁ নিতম্ব, মধ্যপ্রদেশ।

৩০। শোন- দেবীর ডান নিতম্ব, মধ্যপ্রদেশ।

৩১। রামগিরি- দেবীর ডান স্তন, উত্তরপ্রদেশ।

৩২। বৃন্দাবন- দেবীর কেশজাল, ভূতেশ্বর মন্দির।

৩৩। শূচি বা অনল- দেবীর ওপরের দাঁতের পাটি, কন্যাকুমারী, ত্রিবান্দ্রম।

৩৪। পঞ্চসায়র- দেবীর অধোদন্তপংক্তি, সঠিক অবস্থান অজানা।

৩৫। করতোয়াতট- সতীর তল্প, বগ্ডুড়া, বাংলাদেশ।

৩৬। শ্রীপর্বত- সতীর ডান তল্প, গুন্টুর, অন্ধ্রপ্রদেশ।

৩৭। বিভাষ- দেবীর বাম গুল্ফ, তমলুক, মেদিনীপুর।

৩৮। প্রভাস- দেবীর উদর, কাথিয়াওয়ারা।

৩৯। ভৈরব পর্বত- দেবীর ঊর্ধ্ব ওষ্ঠ, উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ।

৪০। জনস্থানে/জলেস্থলে- সতীর চিবুক, নাসিক, মহারাষ্ট্র।

৪১। গোদাবরীতট- সতীর বাম গণ্ড, রাজমহেন্দ্রী, অন্ধ্রপ্রদেশ।

৪২। রত্নাবলী- দেবীর ডান স্কন্ধ, খানাকুল, হুগলী।

৪৩। মিথিলা- দেবীর বাম স্কন্ধ, সঠিক স্থান অজানা।

৪৪। নলহাটি- দেবীর নলা, নলহাটি, বীরভূম।

৪৫। কর্ণাট- দেবীর কর্ণদ্বয়, সঠিক স্থান অজানা।

৪৬। বক্রেশ্বর- দেবীর মন/ভ্রূমধ্যস্থ, দুবরাজপুর, বীরভূম।

৪৭। যশোহর- দেবীর পানিপদ্ম, খুলনা, বাংলাদেশ।

৪৮। অট্টহাস- দেবীর ওষ্ঠ, লাভপুর, বীরভূম।

৪৯। নন্দপুর- দেবীর হার, সাঁইথিয়া, বীরভূম।

৫০। লঙ্কা- দেবীর নূপুর, শ্রীলঙ্কা।

৫১। বিরাট- দেবীর উত্তর পাদাঙ্গুলি, জয়পুর।

এই স্থানগুলি কিন্তু ভারত ভূখন্ডে যেমন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত।।

মহাপীঠ নিরূপণ নামে একটি জনপ্রিয় প্রাচীন পান্ডুলিপিতে (১৬৯১-১৭২০) এসব পীঠের নাম উলে­খ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে বৃহৎ বঙ্গে এবং এর পরিপার্শ্বের এলাকাগুলিতে অবস্থিত মোট ২৩টি পীঠ শনাক্তীকৃত। এগুলির মধ্যে ১৪টি পশ্চিমবঙ্গে এবং ৭টি বাংলাদেশে।



এই তীর্থ স্থান গুলির বেশিরভাগেই প্রস্তর বা শিলাখন্ড পাওয়া গিয়েছে। এই শিলা খন্ড গুলি সম্ভবত মিটিওরাইট বা মহাজাগতিক প্রস্তর। প্রাচীন মানুষের সমাজে এরকম শিলা খন্ডের কাছে ঈশ্বরের তথা ধর্মিয় উপসনালয় বানাতে দেখা গিয়েছে।

আধ্যাত্মিক জগতের ব্যক্তিরা এই মহাজাগতিক প্রস্তরকে সহজেই শনাক্ত করতে পারেন। এবং মহাজাগতিক বস্তু অবশ্যই ঐশ্বরিক। সুদর্শন চক্রে দেবীর দেহ টুকরো হওয়ার ঘটনা একটা, কাল্পনিক গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। কারন, ঈশ্বর কি শুধু ভারতের ছিল? ভারত ভুখন্ডের বাইরে তাদের অস্তিত্ব ছিল না? যদি থেকে থাকবে তবে ভারত ভুখন্ডের বাইরে দেবীর দেহাংশ পড়েনি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ কি দিতে পারবে? সম্ভবত না।

গৌতম বুদ্ধের সমাধির পর তার দেহাংশ ভারত তথা এশিয়ার বিভিন্ন বৌদ্ধ মঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

বৌদ্ধ ধর্মের আগে তান্ত্রিক সমাজে এরুপ প্রথা ছিল। যদি ধরা যায় সতী মানব অবতারে ছিল। তবে তার মহাপ্রয়ানের পর দেহাংশ টুকরো করে ভারতের তান্ত্রিক পীঠস্থান গুলিতে স্থাপন করা হয়েছিল, এবিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। নবম ও দশম শতকে ভারতের তান্ত্রিক কেন্দ্র গুলি হিন্দু ধর্মের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেগুলি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল আছে।

আফগানিস্তান প্রাচীন ভারতীয় ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল একথা কারোর কাছে অজানা নয়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ৫১ সতী পীঠের একটিও আফগানিস্তানে নেই। কিন্তু এক সময় বিভিন্ন ভ্রমনকারীদের বিবরন থেকে আমরা এটা জানতে পারি যে আফগানিস্তানে বহু বৌদ্ধ বিহার ছিল।

এর কারন হিসেবে বলা যেতে পারে, এই সতী পীঠ গুলির রচনা হয়েছিল আরব আক্রমণের পর। বা তখন আফগানিস্তান মুসলমান শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এবং পশ্চিম দিক থেকে বারংবার মুসলিম আক্রমণ চলছিল। ফলে ৫১ সতী পীঠের প্রায় অর্ধেকটা অবিভক্ত বাংলায় রচনা করা হয়েছিল।

আবার কিছু গ্রন্থে সতী পীঠের সংখ্যা ১০৮ বলা হয়েছে। ১০৮ সনাতন ধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। তবে এও হতে পারে মুসলমান আক্রমণের পরবর্তী পর্যায়ে বহু স্থান সনাতন বা তান্ত্রিক সমাজের হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার কারনে সংখ্যা সঙ্কুচিত করা হয়েছিল।

আবার এই তান্ত্রিক পীঠস্থান গুলো বৌদ্ধ ধর্মেরও হতে পারে। এর খানিকটা আধ্যাত্মিক ইতিহাসের খবরে পাওয়া যায় ঋষি বশিষ্ঠের সময়। এই বশিষ্ঠকে সাধন ক্ষেত্র আজকের তারাপীঠের বর্ননা দিয়েছিল কোনো এক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী গুরু, যিনি তিব্বত বা চায়নায় থাকতেন।

এবারে রহস্য হলো চৈনিক গুরু কি উপায়ে সতী পীঠের খবর রাখবেন? এবং কেনই বা রাখবেন? রাখতে পারেন যদি বৌদ্ধ ধর্মের উপসনা স্থান হিন্দু মন্দিরে রুপান্তরিত করা হয়ে থাকে। দশম শতকে হিন্দু ধর্মের উত্থানের সময় অনেক বৌদ্ধ মন্দির হিন্দু মন্দিরে রুপান্তরিত হয়েছিল।

আবার অন্য একটি সম্ভবনাও রয়েছে। বৃহত্তর বাংলার যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল তার অন্তর্বর্তী বিভিন্ন তান্ত্রিক পীঠস্থানে সতী পীঠের রচনা করা হয়েছিল। যদিও এই তত্ত্বে অনেক দ্বিমত আছে। তার একটা প্রধান কারণ হলো বিহারে একটিও সতী পীঠ নেই। কিন্তু প্রাচীন বিহারের মগধে বাংলার রাজধানী ছিল। আবার, এও হতে পারে মগধ বিহারের বাইরের কোন স্থান। ফলে বিহারে কোন সতী পীঠ গড়ে ওঠেনি। বা বিহারের বৌদ্ধ ধর্মের যে শাখা শক্তিশালী ছিল তারা তান্ত্রিক ধর্মকে মান্যতা দিত না।

আরো একটি বিষয় লক্ষ্য রাখবেন যে অষ্টম শতকের পরবর্তী সময়ে বাংলাতে কায়স্ত সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন থেকেই বাংলার বৃহত্তর সীমান্ত সঙ্কুচিত হওয়া শুরু হয়। বলা যেতে পারে আফগানিস্তান মুসলমান অধিকারে চলে যাওয়ায় কায়স্তেরা দলে দলে বাংলাতে ফিরে এসেছিল। বাংলাতে সেই সময় পশ্চিম ভারতের সীমান্ত থেকে প্রচুর মানুষের আগমনের একটি তত্ত্ব রয়েছে। এবং ভারতের এই তান্ত্রিক সমাজ তখন হয়তো কায়স্তেরাই পরিচালনা করে থাকবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, আর সেটি হলো তান্ত্রিক ধর্মই হিন্দু ধর্ম নামে রুপান্তরিত হয়েছিল। কারন অবশ্যই ভারতের প্রাচীন তান্ত্রিক সমাজকে রক্ষা করা। এবং বৃহত্তর বঙ্গের বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী যে এর পৃষ্ঠপোষক ছিল এবিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। এই হিন্দু ধর্মের নামটিও একটি বাংলা শব্দ থেকেই আগত। আর সেটি হলো “হিন্দোল” বা দোলনা, যা কৃষ্ণের সাথে সরাসরি যুক্ত।

বিভিন্ন ভ্রমনকারীদের বিবরন থেকে জানা যায় এক সময় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বহু বৌদ্ধ বিহার ছিল। আজ সেগুলো মসজিদ। ঈশ্বরের উপসনার স্থান পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যুগে যুগে ধর্মের পরিবর্তন ঘটে আর বিহার হয় মন্দির আর মন্দির হয় মসজিদ।

প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি লাইক দিয়ে অনুসরণ বা ফলো করুন।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply