
আমি রুটি বেলতে পারি না। আটা যদিও মাখতে পারি, কিন্তু রুটি ঠিক মতো গোলাকার হয় না। আমার একটা অদ্ভূত ক্ষমতা আছে, তা হলো আমি কোন কিছু শেখার জন্য যদি একবার দেখি তবে তা যতই শক্ত কাজ হোক তা আমার শেখা হয়ে যায়। যদিও রুটি টা দেখবো দেখবো করে কখনো দেখা হয়নি।
যাইহোক, অনেক আগে একদিন যারা ফুলের সাজসজ্জা করে তাদের কাজ দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলাম। তখনও প্লাস্টিকের ফুল বাজারে আসেনি। ওরা কোন বিয়ে বাড়ির অর্ডারের কাজ করছিল। আমি ওদের বললাম আমি একটা ডিজাইন বানাতে চাই। ওদের প্রধান কারীগর বলল, এটা দেখতে যতটা সহজ, করতে ততটা সহজ নয়। এই জায়গায় আসতে কোন কারিগরের ৭-১০ বছর লেগে যায়।
আমি বলেছিলাম যে একটা করে তো দেখি। জোরাজুরিতে রাজী হয়ে গেল। এমন ডিজাইন করে দিয়েছিলাম যে দেখে ওরা অবাক। ওরা আগ্রহ প্রকাশ করায় শিখিয়ে দিলাম। প্রধান কারীগর সেদিন একটা কথা বলেছিল। যে ভাগ্যিস আপনি আমাদের লাইনে নেই। থাকলে বহু মানুষ খেতে পেত না।
এক সময় আমার রিপ্রোডাকশন পেয়েন্টিং এর গ্যালারি ছিল। এবং নিজের ফ্রেমার ছিল, যে অর্ডার অনুযায়ী ফ্রেম বানাতো। এই ফ্রেমারদের খুব ডিমান্ড বা কদর এবং তার দুটো কারন তা হলো মাপ করে ফ্রেম কাটা আর কাঁচ কাটা। এরা তখন ঘুরে ঘুরে কাজ করতেন। এরকম একজন আমার ফ্রেম তৈরী করতেন। আমি তখন মুঘল মিনিয়েচার পেয়েন্টিং এর একচেটিয়া প্রস্তুত কারক। এমনকি একবার আমাকে লস এঞ্জেলেস স্টেট গ্যালারি থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগে একটি প্রদর্শনী করার জন্য।
মুঘল মিনিয়েচার পেয়েন্টিং এর ফ্রেমিং সাধারণ ফ্রেমিং হয় না। মাল্টি প্যাডিং মাল্টি লেভেল এমবসড গ্লাস ফ্রেম হয়। অর্থাৎ বেস ফ্রেমে প্যাডিং করে তাকে এমবসড ফ্রেম করতে হয়। তারপর আবার প্যাডিং, এভাবে তলা থেকে দুই বা তিন ধাপে ফ্রেম তার উপর গ্লাস। আর প্যাডিং এ ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন রকমের কাপড় যেমন সিল্ক, মখমল প্রভৃতি।
যেকোন ফ্রেমারদের কাছে যথেষ্ট শক্ত কাজ। আমার ফ্রেমার যখন বানাতো আমি কখনো কখনো সময় পেলে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতাম। একদিন বললাম আমি নিজেই একটা মাল্টি প্যাডিং গ্লাস ফ্রেম বানাবো। শুনে ফ্রেমার ভদ্রলোক তো হেসেই ফেললেন। বললেন ফ্রেম কাটা খুব শক্ত, উনি ৩৭ বছর ধরে এই কাজ করছেন এবং মাঝে মধ্যে ভুল হয়ে যায়। এই ফ্রেমারদের কাছে দুটি জিনিস থাকে। একটা কাঁচ কাটার ছুরি আর দ্বিতীয়টি ফ্রেম কাটার যন্ত্র। যদিও এখন ফ্রেম অনেক জায়গায় কম্পিউটারাইজড মেশিনে কাটা হয়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐ হাতে কাটা যন্ত্রই ভরসা।
যাইহোক সেদিন একটি মাল্টি এমবসড মাল্টি প্যাডিং গ্লাস ফ্রেম বানিয়ে দিয়েছিলাম। কারিগর ভদ্রলোক কেঁদে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন আপনি স্বয়ং বিশ্বকর্মা , কারণ যা উনি ৩৭ বছরে আয়ত্তে আনতে পারেননি তা আমি কি করে একদিনে করে ফেললাম।
তখনও আধ্যাত্মিক জগতে হাঁটা শুরু হয়নি। তাই ভাবনা আর পাঁচটা মানুষের মতই ছিল। কিন্তু মানব শরীরের ভিতরে যে একটা অন্য কেউ আছে, তখনও সেই উপলব্ধি হয়নি। যখন আত্মা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল তখন এটা বুঝতে পারলাম কোন কিছুরই মাপকাঠি বলে কিছু হয় না। অর্থাৎ আমিও মাপকাঠি হতে পারি। ফলে আমার কাছে সমস্ত কাজ জলের মতো তরল হয়ে গেল।
আমার এক জামাই বাবু জার্মান। ওদের ওখানে প্যান কেকের খুব কদর। একবার ও আমাদের বাড়িতে প্যান কেক বানিয়েছিল। তখন বুঝেছিলাম যে প্যান কেক আর বাঙ্গালীর পিঠের মধ্যে শুধু মিষ্টির তফাত।
আমি কোন কিছুই ঠিক শিখি না, বরং বলা যেতে পারে আগে থেকেই জানি। তা সে যেকোন কাজ হোক না কেন? এরকমটা কিন্তু ছোট থেকে ছিল না। আমি বহু চেষ্টা করেও বাবুল গামের বেলুন ফোলাতে পারিনি, এমনকি ইয়ো ইয়ো ম্যানেজ করতে পারিনি। কিন্তু একদিন দেখলাম আমি এগুলো সব জানি। এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় কি? না শিখে আমি জানলাম কি ভাবে?
আমাদের সহস্র ধার চক্র যাকে ইংরেজীত ক্রাউন চক্র বলে। কুন্ডোলিনী জাগরনে সমস্ত চক্রের মতো সহস্রার চক্রের ও জাগরন ঘটে। কিন্তু জ্ঞান দরজা ততক্ষণ খোলে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সহস্রার চক্রে সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করছি।
মানব শরীরে ১১৪ টি শক্তি চক্র বর্তমান। এগুলোর যেমন কুন্ডোলিনীর মতো জাগরন হয় আবার এগুলোর জন্য আলাদা সাধনা করে সিদ্ধি হয়। অবশ্যই তা একটা জন্মের ব্যাপার নয়। এতে এটা বলা যায় যে হাজার জন্ম কম পড়বে।
এদিকে আমি তো পরোটা বেলতেও পারি না। মানে গোল হয় না। তাই ভাবলাম যদি প্যান কেকের আইডিয়াটা কাজে লাগানো যায় কিনা। তখন এক কাপ ময়দার সাথে দুই চামচ সাদা তেল আর পরিমাণ মতো জল এবং আন্দাজ মতো নুন নিয়ে একটি মিশ্রন তৈরী করলাম।
আলাদা করে পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, আর পাতিলেবু কেটে রাখলাম। একটি ননস্টিক প্যান বা তাওয়া গরম করে তাতে ভালো করে সাদা তেল মাখিয়ে নিলাম। এরপর মিশ্রন থেকে একটা বড় চামচ করে তাওয়ার মাঝখানে একটা মোটামুটি গোল চাকতি বানালাম। এবং ঐ মিশ্রন চামচে করে নিয়ে ঐ চাকতিকে কেন্দ্র ধরে কতকগুলি বৃত্ত বানালাম। এরপর ফাঁকগুলো ভরাট করে দিলাম। আঁচ একটু বাড়িয়ে চারপাশে অল্প একটু তেল দিয়ে দিলাম।
এগ রোল সাধারণত পরোটা দিয়ে তৈরী করা হয়। ফলে বেশ ওজনদার হয়। খুব কম লোক একসাথে দুটো খেতে পারে। এরপর একটা ডিম ফাটিয়ে ঐ প্যান কেকের পরোটা উপর মাখিয়ে দিলাম। যখন ওটা একটু জমাট বাঁধলো। তখন ওটা উল্টে দিলাম আর তিন চার মিনিটে ডিম পরোটা রেডি। এরপর পেঁয়াজ ও কাঁচা লঙ্কা সাথে লেবু ছড়িয়ে, রোল পাকিয়ে নিলাম।
এটা পীঠের মতো নরম কিন্তু পরোটার মতো খাস্তা এবং খেতেও ভালো। অনায়াসে দুটি, তিনটি খাওয়া যায়। ভিতরে পছন্দ মতো অনেক কিছুই যোগ করা যেতে পারে।
আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের ফলে একটা জিনিস হতে বাধ্য, আর সেটা হলো একাকীত্ব। আধ্যাত্মিকতা মানুষকে একা বানিয়ে ছাড়ে। আর যাদের আত্মা জাগরন ঘটে, তাদের তো কথাই নেই। যখন একা তখন সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। এর অবশ্য অনেক গুলো ভালো দিক আছে। তার মধ্যে নিজেকে চিনে নেওয়ার। আর যখন সাথে কেউ নেই তখন রান্না নিজেকেই করতে হবে। না জানলেও উপায় নেই। আত্মা সব কিছু করিয়ে নেয়।
এটাই সাধনা আর জীবনের যতো সমস্যা, আর তার সমাধান ঐ আত্মা দিয়ে দেয়। আইনস্টাইন বলেছিলেন পৃথিবীর সমস্ত বলা কথা দ্বিতীয় বার শোনানো সম্ভব। সত্যিই তাই, সমস্ত জ্ঞান মহাকাশে জমা থাকে। যার সহস্র ধার চক্রে সিদ্ধি হয়, সে সব ডাউনলোড করতে পারে অনায়াসে। কারন, তার তো দরজা খুলে গেছে।
ব্লগটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন। দয়া করে আমাদের ব্লগটি অনুসরণ বা follow করুন, তন্ত্র, আধ্যাত্মিকতা, আত্মা, আধিবিদ্যক, আধিভৌতিকতা, ঈশ্বর, শাস্ত্র সম্পর্কে জানতে।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

