ধ্যানের ধারণা ও বিবর্তন

ধ্যান কথার অর্থ একাগ্র চিত্তে আত্ম নিমগ্নতা। বা পেশি ও স্নায়ুর শিথিলায়নের দ্বারা এক প্রকার আত্মস্থ হওয়া। অথবা, চিন্তন শূন্য মনের রচনা হল ধ্যান। আবার, কোন বিষয় বা বস্তুতে মন সংযোগকেও ধ্যান বলে। সার্বিক ভাবে ধ্যান হল মনের পেশী ভঞ্জন ও প্রদর্শন।

আবার আধ্যাত্মিক সঙ্গায় ধ্যান অর্থে স্থূল চেতনা থেকে সূক্ষ্ম চেতনাতে যাওয়ার প্রয়াসকে ধ্যান বলে।

ধ্যান হল পেশি ও স্নায়ুর শিথিলায়নের মাধ্যমে আত্মনিমগ্ন হওয়া এবং অস্থির মনকে স্থির করা ও মনোযোগ একাগ্র করার প্রক্রিয়া। ধ্যান হলো মনের ব্যায়াম; নীরবে বসে সুনির্দিষ্ট অনুশীলন—বাড়ায় মনোযোগ, সচেতনতা ও সৃজনশীলতা। মনের স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে। প্রশান্তি ও সুখানুভূতি বাড়ানোর পাশাপাশি ঘটায় অন্তর জাগরণ। ধর্মীয় শাস্ত্রে ধ্যান বলতে গভীর চিন্তা , মনকে মুক্ত করে কোনো ঐশী বা কল্পিত শক্তিতে সমর্পিত হওয়া প্রভৃতি বলে উল্লিখিত হয়েছে।

সুনির্দিষ্টভাবে কবে ধ্যানের উৎপত্তি হয়েছিল তা অজানা থাকলেও প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষকগণ একমত যে তা প্রায় ৫০০০ বছর আগে উৎপত্তি লাভ করেছিল। মহেঞ্জোদাড়োর একটি শীলে এক ধ্যান-গম্ভীর মুর্তি দেখা যায়, সেখানে বসার ভঙ্গি হলো আসনপিঁড়ি। সম্ভবত এটি সর্ব প্রাচীন ধ্যানের মুর্তি।



ধ্যানচর্চার সবচেয়ে প্রাচীন দলিল পাওয়া যায় প্রায় ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বেদে। টাও ও বুদ্ধের ধ্যান পদ্ধতির বিকাশ ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০-৫০০ সালে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০-১০০ সালে পতঞ্জলির যোগ সূত্র প্রণীত হয় যেখানে অষ্টাঙ্গা ধ্যানের বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ – খ্রিষ্টাব্দ ২০০ সালে ভগবদ গীতা লিখিত হয় যেখানে যোগ, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক জীবন যাপনের পদ্ধতি নিয়ে বর্ণনা রয়েছে। ৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে জাপানে প্রথম ধ্যান হল খোলা হয়। অষ্টাদশ শতকে ধ্যানের প্রাচীন শিক্ষার অনুবাদ পাশ্চাত্যে পৌঁছায়। বিংশ শতকে ধ্যানের বিভিন্ন মেথড বা ধারা উদ্ভাবিত হয়।

আগে মানুষ ধ্যান করতো সাধনা করার জন্যে, তখন ধ্যান সাধু সন্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ধ্যান করতে গিয়ে মানুষ উপলব্ধি করে যে এতে মানসিক শান্তি লাভ করা যায়, শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সাথে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। তখন ধ্যানের প্রয়োজনীয়তা ও প্রসার বৃদ্ধি পায়।

মানসিক সুস্থতা পেতে গেলে উদ্বেগ, ভয়, ক্রোধ, বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, অস্থিরতা, এবং অনিদ্রা থেকে মুক্তি পেতে হবে। এবং এই সবগুলি সমস্যা থেকে মুক্তির পথ একটাই, এবং তা হলো ধ্যান যোগ।

অনেকেই মনে করেন নিরবে বা চুপচাপ বসে থাকা মানে হলো ধ্যান। কিন্তু, ধ্যান কোন শারীরিক বিষয় নয়, বরং মনের। চুপচাপ বসে তো হনুমানও থাকে, তবে তারা কি ধ্যান করছে? ধ্যান শুধু চুপ করে বসে থাকা নয় বরং ভাবনা শূন্যতা সৃষ্টি করা।

শারীরিক সুস্থতা পেতে রক্তচাপ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ব্যাথা উপশম, এবং স্ব-নিরাময় ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ইনার রিপ্রোগ্রামিং মেডিটেশনের (ধ্যান) থেকে শক্তিশালী আর কিছু হতে পারে না। এছাড়া এই ধ্যানেই সম্পূর্ন মানসিক শক্তির রুপান্তর সম্ভব, এর চর্চায় একাগ্রতা, স্বজ্ঞা, স্মৃতি, স্মরণ শক্তি, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, স্ব-উন্নতি, ব্যক্তিগত উন্নয়নের শিখরে পৌঁছনো সম্ভব।

ধ্যানে এইচ আই ভি, টিউমার, ক্যানসার, আলসার প্রভৃতি সারানো সম্ভব। এ কোন আজগুবি গল্প কথা নয়। কারন পাশ্চাত্যে এই নিয়ে রীতিমত গবেষণা হচ্ছে। আগামী ধ্যান সম্পর্কিত প্রবন্ধে এই গবেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখবো।

ধ্যান কথার অর্থ মনোযোগ বা মনোনিবেশ হলেও, ধ্যান কিন্তু শুধু মনোযোগ নয় বরং মন+যোগ। এখন এই মনের সাথে কিসের যোগের কথা বলা হয়েছে? অন্য সমস্ত ধ্যান মনযোগেই সীমাবদ্ধ কিন্তু ইনার রিপ্রোগ্রামিং ধ্যান সেই সীমান্ত অতিক্রম করে ধ্যানকে একটি শক্তিতে পরিণত করতে সমর্থ হয়েছে।

ইনার রিপ্রোগ্রামিং ধ্যানে এমন কিছু করা সম্ভব যা বাস্তবে অবাস্তব বলে মনে হতে পারে। যেমন স্ব-নিরাময়, তন্ত্রের ষটকর্ম থেকে রক্ষা, শত্রু দমন, টেলিপ্যাথি, আত্মা জাগরন, ঈশ্বর দর্শন, ষড়রিপু দমন প্রভৃতি।

এছাড়া ইনার রিপ্রোগ্রামিং মেডিটেশন বা ধ্যান, একজন ধ্যানকারীকে অতিমানব সত্ত্বায় রুপান্তরিত করতে পারে। যার ফলে সেই ব্যক্তি সমস্ত রকম পার্থিব কামনা যেমন অর্থ, সম্পদ, সুস্থতা, সম্পর্ক, জনপ্রিয়তা, চেহারার চুম্বকিয় আকর্ষণীয়তা, আকাঙ্ক্ষিত চাকরি, আকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক, বিদেশ ভ্রমণ, পরীক্ষায় ভালো ফল, উন্নত জীবন লাভ করতে পারে।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply