বশীকরণ কি সত্যিই কাজ করে?

এখন ইন্টারনেটের যুগ, আর ইন্টারনেটের সার্চে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো বশীকরণ। এখন মানুষ মাত্রই মানুষকে বশীভূত করতে চায়।

বশীকরণ অনেকেই কাছের ও দূরের মানুষকে করতে চান। কাছের জনের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে করে, স্ত্রী স্বামীকে করে, প্রেমিক প্রেমিকাকে করে, প্রেমিকা প্রেমিককে করে, মা ছেলে বা মেয়েকে করে, ভাই ভাইকে বা বোনকে করে, বোন ভাইকে করে, ছেলের ব‌উ শ্বশুর শ্বাশুড়িকে করে। দূরের মানুষের মধ্যে সহকারীকে করে, ভালো লাগার মানুষকে করে, অফিসের বস কে করে, বাড়িওলাকে করে, প্রভৃতি।

প্রথমে জানা যাক বশীকরণ বিষয়টি ঠিক কি? 

তন্ত্র শাস্ত্রে ষটকর্মের একটি ক্রিয়া হলো বশীকরণ। সুতরাং এটি একটি তান্ত্রিক ক্রিয়া বা তান্ত্রিক উপাচার। কাউকে ব্যক্তিগত লাভের আশায় বশীভূত করা বা বশ করার তান্ত্রিক ক্রিয়া হলো বশীকরণ।

এরপর জানা যাক বশীকরণ কি ভাবে কাজ করে? 

শুধু মাত্র সম্পর্কে বশীকরণ করা যায়। অচেনা বা অজানা বা অজ্ঞাত ব্যক্তিকে বশীভূত করা সম্ভব নয়। বশীকরণ প্রয়োগ করতে মন্ত্র, তন্ত্র, যন্ত্র ও যজ্ঞের ব্যবহার করা হয়। তন্ত্র শাস্ত্রে বশীকরণ করতে বিভিন্ন উপায়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাজে বিভিন্ন উপাদানের বিষয়ে বলা আছে। এর মধ্যে বহু উপাদান একেবারেই সহজলভ্য নয়। এমনকি সেগুলো সংগ্ৰহ করতে গেলে বিপদে অথবা আইনের আওতায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনকার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্র আর যন্ত্রের সাহায্যে বশীকরণ সবথেকে গ্ৰহনযোগ্য। বশীকরণের এমন অনেক ক্রিয়া রয়েছে যেগুলো করতে বশকারীকে যাকে বশীভূত করা হচ্ছে তার সামনে উপস্থিত হতে হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বশীভূতকারী বশীভূত করা হচ্ছে তার সামনে উপস্থিত হতে পারে না। সেই সব ক্ষেত্রে দূর থেকে করতে হয়। মন্ত্র ও যন্ত্রের সাহায্যে বশীকরণ যে কোন দূরত্ব থেকে করা যায়। আর এই ক্রিয়া কোন তৃতীয় ব্যক্তি করতে পারে না। অর্থাৎ যে বশীকরণ করতে চাইছেন তাকেই করতে হবে আর সেখানে তান্ত্রিক শুধু মাত্র ক্রিয়া আর উপাচার গুলো সম্পন্ন করতে সহায়তা করেন। বশীকরণে সব সময় দৈব শক্তির ব্যবহার করা হয়। কোন বিশেষ দেবতা বা দেবী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একপ্রকার বিশেষ ভাবনার মানসিক সম্প্রসারণ বা মেন্টাল ট্রান্সমিশন করা হয় যে ব্যক্তিকে বশীভূত করা হচ্ছে তার উপর। ফলে সেই ব্যক্তির বশীকরণ কারী সম্পর্কে ভাবনা ও ধারনা বদলে যায়। সে হ্যালুসিনেট করতে থাকে। বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মহোগ্ৰস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে বশীকরণকারীর প্রতি আকর্ষিত হয়।

কি ভাবে বশীকরণ করা হয়?

তন্ত্র শাস্ত্রে বশীকরণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট নিয়ম দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূজা, ক্রিয়া, উপাচার ও মন্ত্র সাধনা। তন্ত্র শাস্ত্র কিন্তু কোন মানুষের সৃষ্টি নয়। দেবাদিদেব মহাদেবের মুখ থেকে নিঃসৃত কথ্য‌ই হলো তন্ত্র শাস্ত্র। তান্ত্রিক শুধু মাত্র একজন প্র্যাক্টিসনার বা প্রয়োগকারী। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ক্রিয়া করলে বশীকরণ হতে বাধ্য।

তাহলে যে বলা হয় সব সময় বশীকরণ কাজ করে না, তার কারণ কি?

বশীকরণ যেমন করা যায় তেমনি কাটানো‌ও যায়। বেশ কিছু তন্ত্র ক্রিয়া কাটানো বা নিবারণ করা যায়। আবার অনেক ক্রিয়া রয়েছে যেটা কাটানো সম্ভব নয়। ক্রিয়া কাটানো হলে নিয়ম হলো পুনরায় ক্রিয়া করা। যেটা তান্ত্রিকরা খরচের কারনে বলেন না। আর প্রয়োগকারীও অনেক সময় করতে চান না। ফলে বশীকরণ হতে দেরি হয়। এর একমাত্র সমাধান হলো ফল প্রাপ্তির জন্য বিভিন্ন ক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। এতে হয়তো খরচ কিছুটা বেশি পড়বে কিন্তু ফল লাভ হবে। এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সেটি বেশিরভাগ তান্ত্রিক এড়িয়ে যান। তন্ত্র ক্রিয়া বা কালা যাদু (উত্তর ভারতের দেহাতি ভাষায় তন্ত্রের নাম) কিন্তু সবার উপর সমান ভাবে কাজ করে না। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী কতকগুলো বিশেষ গ্ৰহ দোষের প্রভাবে তন্ত্র বা কালা যাদু জাতকের উপর কাজ করতে পারে। যদি সেই ব্যক্তির সেই যোগ না থাকে তবে বশীকরণের কাজ করা শক্ত বা বিলম্ব হতে পারে। আরো একটি বিষয় খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটা হলো গ্ৰহ নক্ষত্রের অবস্থান। যেটা সবসময় পাল্টাচ্ছে। বশীকরণ ক্রিয়া নির্দিষ্ট ঋতুতে নির্দিষ্ট নক্ষত্রের অবস্থানে করতে হয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্ৰহ নক্ষত্রের অবস্থান বদলে যায় আর তার ফলে যাকে বশীকরণ করা হচ্ছে তার উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। এবং ফল পেতে বিলম্ব হয়। যিনি বশীকরণ করতে চাইছেন তাকে উপরোক্ত বিষয় গুলো মাথায় রাখতে হবে কাজ করানোর আগে। এটা মাথায় রাখতে হবে যে তন্ত্র একটি শাস্ত্র কোন ভুডু নয়। শাস্ত্র নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে, চটজলদি কোন কিছুই হয় না।

আরো একটি বিষয় হলো যে বশীকরণ করতে চান, তিনি সব সময় সঠিক তথ্য দেন না। ফলে বিভিন্ন রকমের বাধার সৃষ্টি হয়। 

এক মিনিটে বশীকরণ, এক দিনে বশীকরণ এগুলো সমস্তটাই ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন। কোন তন্ত্র ক্রিয়া এতো কম সময়ে ফল দিতে পারে না। বশীকরণে ব্যবহৃত মন্ত্র কলিযুগে কমকরে চার গুণ বেশি পাঠ করতে হবে নয়তো কাজে আসবে না। তন্ত্র শাস্ত্রে কোন ক্রিয়ার ফল প্রাপ্তির সময় সম্পর্কে কোন নির্ঘণ্ট প্রকাশ করা নেই। অবশ্য কিছু কিছু ক্রিয়া সম্পর্কে প্রাপ্তির বা ফল দানের সময় বলা আছে। তান্ত্রিকরা যে সময় দেন সেটা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। বশীকরণ শুধু মাত্র একটি ক্রিয়া নয় বরং এক প্রকার সাধনা।

এরকম বহু নজির রয়েছে যে বশীকরণ সম্পন্ন হয়েছে এবং তার ফল লাভ হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে দেরি হয়তো হয়েছে কিন্তু ফল লাভ হয়েছে। সুতরাং বশীকরণ করাই যায়।


আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply