ধন্বন্তরি ও ধনতেরাস

ধনতেরাস এমন একটি মানুষ রচিত প্রথা যার সাথে শাস্ত্রের কোন যোগাযোগ নেই। ধনতেরাস শব্দটির উৎপত্তি ধন্বন্তরি থেকে।

ধন্বন্তরি কি বা কে? এর অর্থ হলো দেব-চিকিৎসক, অতি সু-চিকিৎসক। অথবা, অতিশয় সুচিকিৎসক, যে চিকিৎসক রোগ নিরাময়ে কখনো ব্যর্থ হন না। পুরাণমতে সমুদ্রমন্থনের সময় প্রথমেই ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী, ধবল ক্ষীর ও পারিজাত পুষ্পের পাশাপাশি ধন্বন্তরি উঠে আসেন। হাতে ছিল শ্বেত কমন্ডলু পুর্ণ অমৃত। [সূত্র: মহাভারত। আদিপর্ব। সপ্তদশ-অষ্টাদশ অধ্যায়] বিষ্ণুধর্মোত্তরো গ্রন্থমতে এই ধন্বন্তরি ছিলেন চতুর্ভুজ সুদর্শন পুরুষ,শ্যামবর্ণ, পীতাম্বর, সুবর্ণখচিত মুকুটধারী। চারহাতে শঙ্খ, অমৃতভান্ড, অথর্ববেদ, জোঁক এবং সবুজ গুল্মলতা। আজও দক্ষিণভারতের কিছু মন্দিরে ধন্বন্তরির মূর্তিপুজো হয়। সেখানে তার চার হাতে শঙ্খ চক্র অমৃতভান্ড ও গুল্মলতা থাকে।

তিনি উদ্ভব হয়েই সৃষ্টি পালনকর্তা দেব নারায়ণের স্তব করেন, ভগবান নারায়ণ তাকে অব্জদেব ( জলসম্ভুত) নাম দিয়ে পুত্ররূপে স্বীকার করেন। তিনি দেবতাদের পরে জাত হয়েছিলেন বলে যজ্ঞভাগের অধিকারী ছিলেন না।কিন্তু দেব নারায়ণ তাকে বর দিয়েছিলেন “হে পুত্র, তুমি দেবগণের পশ্চাৎ জন্মিয়াছ; অতএব যজ্ঞ ভাগ গ্রহণে সমর্থ হইবে না। কিন্তু দ্বিতীয় জন্মে লোক মধ্যে খ্যাতি লাভ করিবে। গর্ভস্থ অবস্থাতেই তোমার অনিমাদি সিদ্ধি হইৰে । আর সেই শরীরেই তুমি দেবত্ব লাভ করিৰে। দ্বিজগণ চক্রমন্ত্র, ব্রত ও জল দ্বারা তোমায় পূজা করিবেন। তুমি অষ্টবিধ অঙ্গ সমন্বিত আয়ুৰ্ব্বেদ বিধান করিবে। দ্বিতীয় দ্বাপর যুগ উপস্থিত হইলে তুমি জন্ম পরিগ্রহ করিৰে । অতঃপর দ্বাপরে সোম বংশীয় নরপতি দীর্ঘতমার প্রার্থনা অনুসারে অব্জদেব তাঁর পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন । তিনিই পরে সৰ্ব্বরোগ বিনাশক কাশীরাজ ধন্বন্তরী নামে খ্যাত হন ।

“মহর্ষি ভরদ্বাজের থেকে সমুদয় আয়ুৰ্ব্বেদশাস্ত্রে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে, তিনিই প্রথম আয়ুর্বেদশাস্ত্রকে অষ্ট প্রকারে বিভাগ করে শিষ্যগণকে দান করলেন। “(চরক সংহিতা)। সেই হিসাবে ধন্বন্তরি যথার্থ বৈদ্য ছিলেন। এই জন্মে কেতুমান নামে তাঁর এক পুত্র জন্মে। শোনা কথা এই যে, বৈদ্যদের মধ্যে ধন্বন্তরি গোত্রের যারা আছেন, তারা নাকি এই ধন্বন্তরির উত্তরসূরি। আদি ধন্বন্তরি নিজে বলেছেন—“আমি আদিদেব ধন্বন্তরি, অন্তান্ত রোগ এবং বিশেষ শল্যতন্ত্র শিক্ষা দিতে ভূতলে অবতীর্ণ হইয়াছি।’

ধন্বন্তরি মহামন্ত্রেও তারই ছায়া পাই:

।।ওম নম ভগবতে মহা সুদর্শনায় বাসুদেবায় ধন্বন্তরে অমৃত কলস হস্তায়, সর্বভয় বিনাশায় সর্বরোগ নিবারণায় ত্রিলোক্য পতায়ে, ত্রিলোক্য নিধায়ে শ্রী মহা বিষ্ণু স্বরূপা, শ্রী ধনবত্রী স্বরূপা শ্রী শ্রী শ্রী ঔষধ চক্র নারায়ণ স্বহা।

ধনতেরাস এখন একটা স্বর্ণ ক্রয়ের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আদতে এই দিনে ধন্বন্তরি আবির্ভূত হয়েছিলেন বা বলা যায় ধন্বন্তরির জন্মদিন। এর কারনে উত্তর ভারতের বৈদ্য সম্প্রদায়ের চিকিৎসক গন ধনতেরাস এর দিনে ধন্বন্তরির উপসনা করেন।

সেই উপলক্ষে কাপড়, রৌপ্য, স্বর্ণ প্রভৃতি কেনার চল শুরু হয়। এখন সেই প্রথা স্বর্ন ক্রয়ের উৎসবে পরিণত হয়েছে। যদিও সাধারণ মানুষের এই বিষয়ে কোন জ্ঞান নেই।


Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply