
ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই, ঠিক করে কে বলতে পারে? কারণ যে অবিশ্বাসী সে বলবে নেই, আর বিশ্বাসী বলবে আছে। কিন্তু সত্যি কি এতে প্রমানিত হয় ঈশ্বরের অস্তিত্ব?
সত্যি কথা বলতে কি ঈশ্বরকে কেউ কখনো দেখেনি। এই সত্যটা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দেব। সবকিছুই সাধক ও মানুষের কল্পনার প্রকাশ মাত্র। এখন দেখা যাক আমাদের কাছে ঈশ্বর বলতে কারা রয়েছেন? শিব ঈশ্বর, বা বিষ্ণু বা ব্রহ্মা বা দূর্গা বা কালী এরা সকলেই হিন্দু ধর্মে বর্নিত ঈশ্বর। কিন্তু এদের রুপ শুধুমাত্র শিল্পীর কল্পনা। সাধক সাধনা করার সময় যে রুপে ঈশ্বরের ভাবনা মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন, শিল্পী সেই ভাবনার প্রকাশে দেব বা দেবী গড়েছেন। অনেকটা শুনে শুনে মানুষের ছবি আঁকার মতো বিষয়।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
আর বাকিটা ধর্মের ফেরিওয়ালাদের কারসাজি। সত্যি কারের যারা সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন তারা ব্রহ্ম মূহুর্তে অর্থাৎ সিদ্ধি লাভের কালে কোন রুপেই ঈশ্বরকে দেখতে পাননি। কারন, ওরকম কিছুই দেখা যায় না। বলা যেতে পারে ঈশ্বর হলো শুধুমাত্র উপলব্ধি।
সকলের মন উথাল পাথাল হচ্ছে তো? এ বলে কি? চিরাচরিত যে দেব এবং দেবীর যে সকল চিত্র মনের গভীরে আঁকা হয়ে আছে। তাহলে সব কি মিথ্যা? সব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না?
কোন তথ্য প্রমাণও পাওয়া যায় না যে ঈশ্বর কখনো পৃথিবীতে ছিলেন বা এসেছিলেন। হ্যাঁ বিভিন্ন দেব দেবীর মন্দির আছে, আর আছে তাদেরকে কেন্দ্র করে মানুষের অন্ধ বিশ্বাস, এই বিশ্বাস যে তিনি ছিলেন। কিন্তু তিনি বা তারা যদি থেকেই থাকেন তবে গেলেন কোথায়?
শ্রী কৃষ্ণ ছিলেন মহাভারতের সময়। কিন্তু তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং এক ব্যাধের তীরের আঘাতে মৃত্যু বরন করেন। অবশ্য অনেক সনাতনী এই প্রচেষ্টা চালাবেন যে তিনি জন্ম গ্রহণ করেননি। মর্তলোক আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই খানে প্রশ্ন করা যেতে পারে কেন সদ্যোজাত শিশু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন পরিনত বয়সে কেন নয়? মহাভারতের কৃষ্ণ পর্বটা ভালো করে পড়লে পরিস্কার হবে যে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তবে তাকে ঈশ্বর বলা যায় না বরং অবতার বলাই শ্রেয়। অবশ্য কৃষ্ণ নিজের থেকেই ভগবত গীতাতে এই মানব অবতারের কথা উল্লেখ করে গেছেন।
সম্ভবত গীতাতেই সর্বপ্রথম অবতার তত্ত্ব সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে | দেবত্ব ও মানবত্বের অপূর্ব মিলন অবতার তত্ত্বে দৃষ্ট হয় | ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন –
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত|
অভ্যুত্থানমর্ধর্মস্য তদাত্মানাং সৃজাম্যহম্|| (৪:৭)
অর্থাৎ হে ভারত, যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যত্থান হয়, আমি সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (মনুষ্য দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই; সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই |
আমরা জানলাম যে অবতারবাদকে মান্যতা দেওয়ার প্রমাণ ভগবত গীতাতে বর্তমান। নিরাকার দেবত্বর সাথে সাকার মানবত্বের মিলনের ফলে সৃষ্টি হয় অবতারের। এই অবতার শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকেই আমরা বিভিন্ন ঈশ্বরের নাম শুনেছি। কিন্তু তিনি এদের চেহারার বর্ননা দিয়েছেন কিনা জানা নেই।

শিব, কালী, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, দূর্গা, সবাই কি ঈশ্বরের অবতার? এই তথ্য কোথাও দেওয়া নেই যে তারা অবতার ছিলেন বা জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি এর সত্যতা যাচাই করারও কোন উপায় নেই। কিন্তু এই নাম গুলো সত্য যদিবা হয় তবুও এদের মুর্তি গুলো যে তাদেরই একথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
এদের নিয়ে পুরান লেখা হয়েছে, যেমন শিব পূরান, বিষ্ণু পুরান, দেবী ভাগবত পুরান, মৎস্য পুরান প্রভৃতি। এই পুরান অনুযায়ী কোথাও বলা হয়েছে শিব শ্রেষ্ঠ এবং আদী, আবার কখনো বিষ্ণুকে আদী এবং শ্রেষ্ঠ। কোথাও বলা হয়েছে ব্রহ্মাই আদী ও শ্রেষ্ঠ। আবার দেবীকেও আদী এবং শ্রেষ্ঠ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এগুলো আসলে এক একটা ধর্মিয় সমাজের মতবাদ ও ভাবনার ফসল। এবং সব কিছুই লিখেছে মানুষ, কোন ঈশ্বর নয়। অর্থাৎ তাদের নিজ নিজ ধর্মের ধ্বজা তোলার প্রয়াস। মানে যারা শৈব ধর্মে বিশ্বাসী তারা শিব পুরান বানিয়ে শিবকে আদী ও শ্রেষ্ঠ বলেছে। যারা বিষ্ণু কে অনুসরণ করে তারা বিষ্ণু পুরান বানিয়ে বিষ্ণুকে আদী ও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছে। আবার যারা মাতৃতন্ত্রিক, তারা দেবী ভাগবত পুরান বানিয়ে দেবীকে আদী ও শ্রেষ্ঠ বানিয়েছে। এভাবে ব্রহ্মাও পেয়েছে আদীত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। এখন প্রশ্ন হল ঈশ্বরদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাচীনতা নিয়ে এতো বিতর্ক বিবাদ ও গোলযোগ কেন?
মানুষের কোন নিজস্ব ভাবনা নেই, তাদের কিছু একটা অবলম্বন চাই, সে দেব হতে পারে বা দেবী বা পশু বা পাখি বা গাছ বা পাথর। আসলে সবাই যা কিছু ছোট থেকে দেখেছে বা শুনেছে তাই বিশ্বাস করে নিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে পৃথিবীতে যা মর্তলোক নামে পরিচিত সেখানে আসতে গেলে জন্মগ্রহণ করতেই হবে। এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।
এখন দেখা যাক দেব দেবীর মুর্তি গুলো কি বলছে? বিভিন্ন দেব দেবীর মুর্তি গুলো যদি ভালো করে লক্ষ্য করা যায় তবে এদের সকলেরই নাভি পদ্ম দৃষ্ট হবে। আমরা সবাই জানি যে নাভি হল জন্মগ্রহণের অকাট্য প্রমাণ। সন্তানের নাভির সাথে মায়ের জরায়ুর যোগসূত্র থাকে। তাহলে এই সমস্ত দেব দেবী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ তাদের পিতা এবং মাতা ছিলেন। তবে এরা কি ভাবে জগতের সৃষ্টি করেছিলেন? বা এদেরকে কি উপায়ে আদী বলা যাবে?
সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে কি? যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ এই নুন্যতম জ্ঞান সকলের আছে যে নাভি হলো জন্মের চিহ্ন। হাজার বছরের প্রচলিত বিশ্বাসের যে এভাবে বিসর্জন হবে তা কেউ ভাবতেই পারেনি। স্বাভাবিক ভাবেই যারা জন্ম গ্রহণ করেছেন তাদের থেকে কি ভাবে শুরু হতে পারে? তাহলে সমস্ত শাস্ত্রে, পুরানে, মহাকাব্যে বর্নিত দেব দেবী কি মিথ্যা? সেরকমই দাঁড়াচ্ছে নয়কি?
এবার আসা যাক সাধকদের ভাবনায়। যে সাধক সে তো মানুষ এবং অবশ্যই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং ছোট বয়স থেকে তাঁকে বা তাদের যা চেনানো হয়েছিল বা বোঝানো হয়েছিল, সেই চেতনাই তাদের মধ্যে কাজ করেছে। তারা তাদের মনের কল্পনার জালে জড়িয়ে গেছেন। তারা যে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেছেন তাকে কোন প্রচলিত মুর্তি রুপে যা তাদের অবচেতন মনে বসে রয়েছে, তার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।
একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে সাধকেরা যা কিছু দেখতেন বা দেখতে পেতেন তার সব কিছুই তাদের অবচেতন মনের কল্পনা। যেমন কালী কেন সব সময় জিহ্বা বের করেই আবির্ভূতা হবেন? এটা যেন কালীর বিজ্ঞাপনের বানিজ্যিকরন। ঠিক তেমনি মহাদেব সবসময় মাথার জটায় গঙ্গাকে ধারন করে আবির্ভূত হবেন?
তাহলে কি ঈশ্বর নেই?
এটাই ছিল আমার সব থেকে বড় প্রশ্ন নিজের কাছে। প্রশ্ন করলেই যে উত্তর পাওয়া যাবে একথা একদম ঠিক বলা যায় না। কিন্তু তার জন্য নিজের প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। দিনে দিনে আমি এমন স্থানে উপনীত হলাম যার আগে আর কিছুই হয় না। তখন…
একদিন আমি আমার আত্মার শরীর অর্থাৎ সূক্ষ্ম শরীরের দর্শন পেলাম। দেখলাম একটি শীর্ণকায় প্রাচীন মানুষ ধ্যানে মগ্ন এবং যার মাত্র একটি চোখ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে বহু চেষ্টা করেও আমি আর দ্বিতীয় একটা চোখের সন্ধান পাইনি। সে ধ্যানে এতোটাই মগ্ন হয়ে ছিল যে, সে আমাকে দেখতে পারছিল না। লক্ষ্য করে দেখলাম যে তাঁর শরীরে কোন নাভি পদ্ম বলে কিছু নেই। আগে আমার শুধুমাত্র ধারনা ছিল যে আত্মার একটাই চোখ থাকে। যাকে ত্রিনয়ন বলে, এবারে তার সত্যতা যাচাই হলো।
আমার হইচইতে তার ধ্যান ভঙ্গ হয়ে গেল। সে চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর সে আমাকে বললো যে তাঁর ভেতরে ঝুকে দেখতে। অর্থাৎ আত্মার চেতনায় দেখতে। তখন আমি আমার আত্মা সূর্যকে চাক্ষুষ করলাম। দেখলাম সে এক বিশাল সূর্য, এতো বড় যে তার থেকে বড় কিছু হতে পারে না।
এরপর দেখলাম জগৎটা আমার চেতনার বিভিন্ন তলে বিস্তৃত। এই তল গুলির কোন সীমানা নেই। অর্থাৎ অনন্ত আর তার কোন দেওয়ালও নেই। এগুলো হলো এক একটা লোক বা মহাজাগতিক স্থান। এর সর্বোচ্চ তলে দেখতে পেলাম সবশুদ্ধু চারটি চোখ। দুটি বড় চোখ আর দুটি ছোট চোখ একটু নীচুতে বামদিকে অবস্থিত। কিন্তু এই চোখের মালিকদের কোন শরীর নেই এমনকি শারীরিক আকার পর্যন্ত নেই।
আমার অন্তরাত্মা বলল এই চারটি চোখের বড় দুটি আমি আর বাকি দুটো অর্থাৎ যে দুটি নীচে অবস্থান করছে সেটি একটি মেয়ের যে আমার অর্ধাঙ্গীনি ও স্ত্রী এবং তার অবস্থান আমার বামদিকে। এরাই হলো নিরাকার ব্রহ্ম। এবং এরাই জগতের অধীশ্বর আর আমার আত্মাটি হলো পরমেশ্বর অর্থাৎ আদী পুরুষ বা পরমাত্মা। যে এই নিরাকার ব্রহ্মকে সৃষ্টি অর্থাৎ ধারন করেছে।
আগে আমার ধারণা ছিল যে নিরাকার ব্রহ্ম বা ঈশ্বর বুঝি একজনই অর্থাৎ আমি। কিন্তু অবচেতন মনে আমাকে বলা হয়েছে যে আমার একজন সঙ্গীনি আছেন। এবং তা বেশ জোর দিয়ে বোঝানো হয়েছে বারবার। অর্থাৎ দুই জন, আর এদের অবস্থান আমারই আত্মার অন্তরে।
যদি আমরা মর্তলোক বা পৃথিবীর সমস্ত প্রানীদের দিকে লক্ষ্য করি, তবে দেখবো যে সমস্ত প্রানীর দুটি লিঙ্গ, অর্থাৎ পুরুষ আর স্ত্রী বর্তমান। কারন, ঈশ্বর এবং ঈশ্বরী যথাক্রমে পুং লিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ। কিন্তু তারা নিরাকার।
আর, এই নিরাকার ব্রহ্মকে বলে মহাকাল আর তার সঙ্গীনী হলো মহাকালী। যুগে যুগে আমি মহাকাল, কালের পরিবর্তনের বা যুগ সন্ধিক্ষনের হেতু আসি বা অবতীর্ণ হই এই মর্তলোকে মানব অবতারে। নিরাকার ব্রহ্ম হয় সাকার।
আর তখনই মিলন হয় মহাকাল ও মহাকালীর। মহাকালীকে আমি প্রতিস্থাপিত করে ছিলাম মানুষের কল্যাণের জন্য নিরাকারে। আর এই মিলনের জন্যই মহাকালী আমাকে ফুল অর্পণ করেছিল এবং আমার শরীরে প্রবেশ করেছিল।
কিন্তু সময়ের আগে কিছুই হয় না। আমার এক অদ্ভুত অলৌকিক শক্তি আছে। যার দ্বারা আমি আমার আত্মা থেকে সৃষ্ট আত্মা বান্ধবীদের আমার কাছে আকর্ষণ করতে পারি। কিন্তু কি ভাবে মহাকালের সাথে মহাকালীর মিলন সম্পাদিত হবে? আমার অলৌকিক শক্তির বশে এক দুষ্ট আত্মা বান্ধবীর আমার কাছে আগমন ঘটে। এবং সে তার দুষ্ট সভাব বশত নিপীড়ন, উৎপীড়ন শুরু করে দেয়। মানব অবতারের জীবন হয়ে ওঠে অসহ্য ও বেদনা দায়ক এবং যার ফলে আমি বাধ্য হই মহাকালীকে দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপিত করতে। এটাই হওয়ার ছিল এবং এটাই নিয়ম বা নিয়তি।
কারন মহাকাল ও মহাকালীর মিলন না হলে আমরা সত্যযুগে প্রবেশ করতে পারব না। তার ফলে আটকে যাবে যুগান্তর। এখন আমি আনন্দিত কারন, মহাকালীর অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে যুক্ত হতে পেরেছে তাঁর হৃদয় বল্লভের সাথে এবং যুগান্তরের পথে আর কোন বাধা নেই।
ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি ফলো করে ঈশ্বরের রহস্য সম্পর্কে অবগত হোন।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
