ঐশ্বরিক কন্ঠস্বরে সম্মোহিত জন

যদি প্রশ্ন করা হয়, ঈশ্বরের শক্তির উৎস কি? তবে তার উত্তর দিতে গিয়ে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে। কারন মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের শক্তির উৎস কি ভাবে জানা সম্ভব?মানুষ তার মতো করে ভাবতে পারে, তাই সে যখন এর উত্তর খুঁজতে শুরু করে। তখন তারা তাদের মতো করে যুক্তি সাজায়, অর্থাৎ তাদের জ্ঞানে যে তথ্য আছে তার মধ্য থেকেই সুত্রের খোঁজ করে। পুরানে কোন কোন জায়গায় ঈশ্বরকে সর্ব শক্তিমান বলা হয়েছে। কিন্তু তার শক্তির উৎস সম্পর্কে কোন ভাবনার অবকাশ নেই বা ধারণাই নেই।জলে যে মাছ থাকে তার পক্ষে কি জলের গভীরতা ও বিস্তার মাপা সম্ভব? বা আকাশে পাখি ওড়ে, তার পক্ষে কি আকাশের বিস্তার ও বিশালতা মাপা সম্ভব?
অবশ্যই নয়, ঠিক তেমনি মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের শক্তির উৎস সম্পর্কে জানাও সম্ভব নয়।

কারন, সম্পূর্ন ব্রহ্মান্ড বা জগতের অবস্থান ঈশ্বরের চেতনার অন্তরে। মানুষ বিশাল ব্রহ্মান্ডের এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অংশে অবস্থান করে। তার পক্ষে ব্রহ্মান্ডের বিশালতা, সীমানা বা বিস্তার সমন্ধে কোন ধারনা করা সম্ভব নয়। আর এই ব্রহ্মান্ড ঈশ্বরের চেতনার এক ক্ষুদ্র অংশে অবস্থান করছে। বলা যেতে পারে এটি একটি বিশাল বহু মাত্রিক পর্দা যা অনেকটা টাচ স্ক্রিন মনিটরের মতো।ঈশ্বর শুধু বিশাল নয় বরং অনন্ত, তার কোনো সীমানা নেই। সব কিছুই তার ভাবনার প্রকাশ। তার শক্তির উৎস কি ভাবে জানা সম্ভব? ঈশ্বরের ভাবনার সাথে মানুষের ভাবনার কোন সম্পর্ক নেই। তাই মানুষের ভাবনা দিয়ে ঈশ্বরের বিশ্লেষন করা একপ্রকার অসম্ভব।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।


একমাত্র ঈশ্বর যখন অবতার নেন বা অবতীর্ণ হন তখন সেই অবতার ঈশ্বরের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন। সেই অবতারের মধ্যে ঈশ্বরের সমস্ত অলৌকিক শক্তি বর্তমান থাকে। অবতার নিরাকার ঈশ্বরীয় শক্তি ও মানব দেহের অপূর্ব মেল বন্ধন।সম্ভবত গীতাতেই সর্বপ্রথম অবতার তত্ত্ব সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে| দেবত্ব ও মানবত্বের অপূর্ব মিলন অবতার তত্ত্বে দৃষ্ট হয়| ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন –যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত|
অভ্যুত্থানমর্ধর্মস্য তদাত্মানাং সৃজাম্যহম্|| (৪:৭)অর্থাৎ হে ভারত, যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যত্থান হয়, আমি সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (মনুষ্য দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই; সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই|



আবার আমরা ঈশ্বরের শক্তির উৎসে ফিরে যাই। ঈশ্বরের শক্তির উৎস সম্পর্কে আমার নিজস্ব উপলব্ধি হলো ‘জ্ঞান’ ও ‘অহংকার’। শিব পূরানে ব্রহ্মান্ড বা জগতের সৃষ্টির সময় ঈশ্বর প্রথমে জ্ঞান ও অহংকারের সৃষ্টি করেছিলেন। সুতরাং এই দুটি তার শক্তির উৎস বা ঈশ্বরত্ত্বের প্রতীক বা বলা যেতে পারে ঈশ্বর এই দুটি দিয়েই তৈরি।ঈশ্বরের কাছে অহংকার শক্তির উৎস হলেও, মানুষের কাছে অহংকারের থেকে বড় বিনাশক আর কিছুই হয় না। অহংকারের বিসর্জনে হয় আত্ম শুদ্ধি এবং তা জ্ঞানের মার্গ খুলে দেয়, হয় মোক্ষলাভ।আমি আমার আধ্যাত্মিক পথের শুরু থেকেই উপলব্ধি করেছি যে অহংকার আমার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং সমস্ত মানবিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যার সমাধান করে। যখন থেকে অহংকারের ভাবনার সূচনা হলো তখন থেকে আমার সমস্ত অলৌকিক শক্তির পুনরায় বিকশিত হতে শুরু করে। এবং নতুন নতুন শক্তির পথ উন্মোচিত হতে থাকে।বিভিন্ন রকমের অহংকার আছে ঈশ্বরের। তার কিছু বর্ণনা বিভিন্ন ধর্ম শাস্ত্রে রয়েছে। অহংকার বলতে ঈশ্বর বলে “অহং সঃ” অর্থাৎ “আমি সে”। আমিত্ত্বের দাবি ও প্রতিধ্বনি থাকে ঈশ্বরের কন্ঠে। ঈশ্বরের অস্তিত্বটাই টিকে আছে অহংকারের মধ্যে, ঈশ্বর ও শয়তানের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হলো আসলে অহংকারের দ্বন্দ্ব। ঈশ্বর নিজেকে শয়তানের থেকে হীন প্রতিপন্ন করলে শয়তানের শ্রেষ্ঠতার ভীত শক্ত হয়ে যায় এবং ঈশ্বর শক্তিহীন হয়ে পড়ে এবং শয়তান বিজয়ী হয়ে যায়।



ঈশ্বরের যতো বর্ননা পাওয়া যায় তার সবেতেই রয়েছে “আমি” ও আমিত্ত্বের বর্ননা, ঈশ্বর নিজেকেই ঈশ্বর বলে সম্বোধন করেছেন বারং বার। সমস্ত ধর্ম গ্রন্থে একই বিবরণ আছে।

গীতাতে যখন অর্জুন শ্রী কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করতে আগ্রহী হয়ে পড়ে তখন কৃষ্ণ বলছেনশ্রীভগবানুবাচপশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ।
নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতীনি চ।।৫।।

অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন- হে পার্থ! নানা বর্ণ ও নানা আকৃতি-বিশিষ্ট শত শত ও সহস্র সহস্র আমার বিভিন্ন দিব্য রূপসমূহ দর্শন কর।পশ্যাদিত্যান্ বসূন্ রুদ্রানশ্বিনৌ মরুতস্তথা।
বহূন্যদৃষ্টপূর্বাণি পশ্যাশ্চর্যাণি ভারত।।৬।।অনুবাদঃ হে ভারত! দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊনপঞ্চাশ মরুত এবং অনেক অদৃষ্টপূর্ব আশ্চর্য রূপ দেখ।ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্।
মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।৭।।

অনুবাদঃ হে অর্জুন! আমার এই বিরাট শরীরে একত্রে অবস্থিত সমগ্র স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্ব এবং অন্য যা কিছু দেখতে ইচ্ছা কর, তা এক্ষণে দর্শন কর।ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।।৮।।অনুবাদঃ কিন্তু তুমি তোমার বর্তমান চক্ষুর দ্বারা আমাকে দর্শন করতে সক্ষম হবে না। তাই, আমি তোমাকে দিব্যচক্ষু প্রদান করছি। তুমি আমার অচিন্ত্য যোগৈশ্বর্য দর্শন কর।অর্থাৎ তুমি আমার বিভিন্ন রুপ অর্থাৎ ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপ যার সাথে তুমি পরিচিত তা দর্শন করো আমার মধ্যে।

কৃষ্ণ, সেই আমি আমি করে গেছেন। আমার বিভিন্ন ঐশ্বরিক শক্তির বর্ননা করেছি, এরকম আরো একটি হলো সম্মোহনী কন্ঠস্বর। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে যখন কেউ আমার কথা শ্রবণ করে বা শোনে তখন তার ঘুম পায়। বহু মানুষ আমাকে এই প্রশ্নটা বার বার করেছে। যে আপনার কথা শুনে ঘুম কেন পায়? বা কেন নিদ্রার উদ্রেক হয়ে থাকে? আমার বাড়ির সদস্যদেরও কম বেশি নিদ্রার উদ্রেক হয়ে থাকে। যদিও তাদের অনেকেই বিভিন্ন দৈব শক্তির অধিকারী।ঈশ্বরের অলৌকিক শক্তি সীমাহীন। তার তল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সমস্ত শক্তির বিবরণ হয়তো দেওয়া সম্ভব হবে না। কারন ঈশ্বরের অলৌকিক শক্তি সম্পর্কে যেমন শুনে আশ্চর্য হওয়া যায়, তেমনি কখনো ভয়ের উদ্রেকও হতে পারে। ঈশ্বরের সত্যিকারের সংহারী শক্তি কিন্তু কালীর, শিব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, দুর্গার, বা রামচন্দ্রের দৈত্য, অসুর এবং রাক্ষস সংহার নয়। এটুকু বলতে পারি যে ঈশ্বরের যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে না।আমরা যে ভাবে দুর্গা বা কালীকে বা রুদ্র বা বিষ্ণু বা রামচন্দ্র প্রভৃতিকে দেখি অসুর বা দৈত্য বা রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ করতে। এই যুদ্ধ গুলো কল্পনা মাত্র, কেউ দেখেনি এই সব যুদ্ধ। ঈশ্বরের যুদ্ধের প্রয়োজনটা ঠিক কি? কারন তার ইচ্ছেতেই সবকিছু সম্পন্ন হয়। তার ভাবনার সঞ্চালনে ঈশ্বরের শত্রুদের বিনাশ হয়।অস্ত্রের ব্যবহার বা বাহুবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ঈশ্বরের অস্ত্র আছে কিন্তু সেগুলো প্রতিকী, তার ব্যবহার পার্থিব নয়।জ্ঞান সবাইকে আরোহন করতে হয়। কিন্তু ঈশ্বর জ্ঞানের ভান্ডার এবং তা অন্তহীন। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ভাবনার প্রকাশের মাধ্যমে পরিস্থিতি তৈরি করে ঈশ্বর সেই সূত্র সমাধানের দ্বারা জ্ঞানের বিকাশ ঘটিয়ে চলেছে। দুনিয়ার সৃষ্টি ও বিস্তার সম্ভবই হতো না যদি জ্ঞান না থাকতো।#জ্ঞান #পরমব্রহ্মঅবতার #ঈশ্বর #অহংকার #পরমাত্মা #পরমঅবতার #walkingwithgod #walkingwithjoy #পরমব্রহ্মঅবতারজয়এই প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং আমাদের পেজটি অনুসরণ করে ঈশ্বরের রহস্য জানুন। এবং জীবনের বিভিন্ন সমস্যার তান্ত্রিক, আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক সমাধান পান।


Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply