
তন্ত্র সাধনাতে আসনের গুরুত্ব অপরিসীম। অবশ্যি সমস্ত সাধনে আসনের বিশেষ বিশেষ গুরুত্ব আছে। যেমনটি আছে বৃক্ষের। পাঁচটি বিভিন্ন প্রানীর করোটি ও মানুষের করোটি দিয়ে প্রস্তুত করা হয় পঞ্চ মুন্ডির আসন। একবার তৈরী হলে যুগ যুগ ধরে সেই আসন খন্ডন হয় না। যদিও সিদ্ধি পর্বে বিসর্জন দেওয়ারও রিতী রয়েছে। তবে তা নির্ভর করে কতোজন সাধক উপবেসন করবেন তার সংখ্যার উপর। এবং তা কয়েক শতাব্দী ব্যাপী হতে পারে।
এই পঞ্চ মুন্ডির অস্তিত্ব একমাত্র ঈশ্বর ও দেবী জানে। কারন তারা দৈব্য দৃষ্টিতে সবকিছু দেখতে পায়। সাধককে, দেবী বা গুরু বলে দেন কোথায় বসে সাধনা করতে হবে। এই পঞ্চ মুন্ডির আসন নিয়ে আমার বিস্তর অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেমন এখন আমি এই আসনেই সব সময় বসে বা শুয়ে থাকি। আমার যুবা বয়সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আজ তা বলবো।
আমি পূর্ব কলকাতায় থাকি। দক্ষিণ কলকাতায় যত আত্মীয় আছে, তাদের মধ্যে কেউ পরলোক গমন করলে কেওড়াতলা মহা শ্মশানে নিয়ে যেতে হয়।
প্রায় বছর তিরিশ আগে একবার গিয়েছিলাম পুরনো শ্মশানে। আদি গঙ্গার ধারে প্রাচীন শ্মশান, সেখানে একটা চাতালে গিয়ে দেখি পঞ্চ মুন্ডির আসনে একটা বাঘ ছাল পাতা। দেখে তো বসতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু প্যান্টে চামড়ার বেল্ট থাকার কারণে বসতে পারিনি। একজন বললেন বেল্টা খুলে বসে পরতে।
আমি বললাম এমনই বসে গেলে হয় না কি? সে বললো সবাই পারে না, তুমি হয়তো পারবে। আর বোঝোইতো নানা মুনির নানা মত। বেল্ট দেখলে দক্ষ যজ্ঞ বাধিয়ে দেবে। তখন যুবা বয়স, আগ্রহ থাকলেও বসা হয়নি। পেছন থেকে কে যেন ডাক দিল।
বসার জন্য আসনটা যেন আমাকে ডাকছিল। বাঘ ছালের পিছনে একটি কালী মুর্তি দাঁড় করানো আছে। মৃত ব্যক্তির দেহ দাহ করতে গেছি। সাধনা করতে তো আর নয়। শ্মশানে আমার বসে থাকতে বেশ লাগে। কতো আত্মার আনাগোনা, আর ওখানে তো আবার আমার নিজের লোকজনের সাথে দেখাও হয়ে যায়।
সেবার ওখানে দেখেছি একটা লোককে, সে একটা মস্ত জাবদা খাতায় অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে কি সব লিখে চলেছে , ঐ বাঘ ছালের পাশে বসে। পাশে আরো একটি লোক বসে। মনে হয় তারা হয়তো একসাথেই এসেছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার পাশাপাশি বসেও কেউ কোন কথা বলছে না।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
শুধু এই টুকুই স্মৃতির জন্যে এই প্রবন্ধটি কি লিখছি? এর মধ্যে অলৌকিকতা কি আছে? অবশ্যই আছে, কারণ ঘটনা এখানে শেষ নয় বরং শুরু।
এরপর যতবার কেওড়াতলা মহা শ্মশানে গিয়েছি, পুরাতন শ্মশানে যেখানে কাঠের চুল্লি। তখনই ঐ মন্দির চাতালে পৌঁছে গেছি এক অদৃশ্য আকর্ষনে, দেখেছি বাঘ ছাল অপসৃত হয়েছে। সেখানে কালী মূর্তিটি এনে বসানো হয়েছে।
আর যথারীতি ঐ দুই জন উপস্থিত, সেই এক বেশ আর সেই এক কর্ম অতিবাহিত হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। একজন মস্ত এক জাবদা খাতায় কি সব লিখে চলেছেন আর অন্যজনের কোন কিছুতেই হুঁশ নেই। যেন চিত্রগুপ্ত জন্ম মৃত্যুর হিসেব রাখছে, আর পাশে স্বয়ং যম বিরাজমান।

ততদিনে বৈদ্যুতিক চুল্লি বসানো হয়েছে, ফলে প্রাচীন আর নবীন শ্মশানে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে মহা শ্মশান। এখন মাঝে রয়েছে মাইসোর উদ্যান। কালের পথে মজে গিয়েছে আদী গঙ্গা, মানুষের পাপের পাঁকে দুর্গন্ধে পাশে দাঁড়নোই দায়।
কিন্তু কি এক টান অনুভব করি, যখনই ওখানে গিয়েছি। বারং বার ঢুঁ মেরেছি আদী শ্মশানের মন্দিরের চাতালে ঐ পঞ্চ মুন্ডির আসনের নিকটে। শেষেরবার যেবার গেলাম, সেবার দেখা মিলল আরও এক স্থানীয় ভদ্রলোকের সাথে।
কথায় কথায় তাকে বললাম, এখন যেখানে কালী মূর্তিটি রাখা আছে আগে সেখানে একটা বাঘের ছাল পাতা ছিল। আর ওর তলায় আছে পঞ্চ মুন্ডির আসন। আমার কথা শুনে লোকটি চমকে উঠল। জিজ্ঞেস করলো যে আমি আশেপাশে কোথাও থাকি কিনা? থাকি না, শুনে বললেন, এ অসম্ভব কারন আমার বয়স ষাট বছর। আর ছোট্ট বেলা থেকে এখানে আসছি, এই পাড়াতেই থাকি। আমি কোন বাঘছাল দেখিনি, ওখানে ছোট থেকে কালী মূর্তি দেখে আসছি। আমার বাবা কেন, ঠাকুরদাও দেখেনি। তবে তারা বলতেন ওখানে আসনের উপর আগে বাঘছাল পাতা থাকতো। সে তো একশ দেড়শো বছরের আগের কথা। সেটা আমি কি ভাবে জানলাম?
আমি বললাম আমি নিজের চোখে দেখেছি। কালী মূর্তির সামনে বাঘ ছাল পাতা ছিল, যার নীচে পঞ্চ মুন্ডির আসন। কথায় কথায় ভিড় হয়ে গিয়েছিল, সবাই হতবাক। আমার ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল তাই আর পিছনে তাকানো হয়নি।
কে জানে এভাবে কতো পথ চলেছি, আজ যা জানা কাল তা হবে অজানা। যেখানে সিদ্ধিই লক্ষ্য সিদ্ধির আসন বা পথ নয়, তাই সাধক এগিয়ে যায় তার লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে।
জীবনই যখন সাধনা এবং ধ্যান মগ্নতাই যেখানে প্রয়াস তখন আধ্যাত্মিকতার পথে হাঁটতে হাঁটতে এরকম কতো আসনেই না বসা হয়েছে। লক্ষ সিদ্ধির কারণে আজ সেই সকল স্মৃতি জ্বলজ্বল করে ওঠে, যখন পথের ধারে দেখা হয়ে যায় পূর্ব জন্মের স্মৃতি বিজড়িত স্থান।
প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি লাইক দিয়ে অনুসরণ করুন এবং ঈশ্বরের রহস্য জানুন ।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

