কালী এবং আমি

মায়ের কাছে শুনেছি যে একদম যখন ছোট, যেমন দুই বা তিন মাস বয়সে বাড়িতে কোন কালো মহিলা দেখলে আমার শরীরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তো। মায়ের এক বান্ধবী খুব কালো ছিল, সে একবার মাকে বলেই ফেলেছিল যে তোর ছেলে তো খুব ফর্সা তাই আমার কালো রং দেখে মনে আঘাত পেয়েছে।

অদ্ভুত ভাবনা নয় কি? দুই তিন মাসের শিশু নিজেকে দেখবে কি ভাবে? এসব আগেকার দিনের লোকজন ভেবে টেবে কথা বলতো না। তবে ছোট বেলায় আমি কালো মহিলা দেখলে তার প্রতি আকৃষ্ট হতাম, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যেটা যুবক বয়সে গিয়ে কালো মেয়ে দেখলে শরীরে একটা শিহরন খেলতো।

আগে কলকাতায় যত গুন্ডা ছিল তারাই বারোয়ারী কালী পুজো করতো। আমাদের বাড়ির পাশে এরকম এক গুন্ডা থাকতো, সেও বেশ ধুমধাম করে কালী পুজো করতো। মনে আছে নার্সারি স্কুল থেকে ফেরার সময়ের স্মৃতিতে, দিগম্বরী কালীর চেহারা আমাকে পাগল বানিয়ে দিতো। কিন্তু তখন বাড়ির লোক বা গাড়ির চালক বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দিত না। জোর করে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিতো।



কালীর পাশে ডাকিনী যোগিনীর মুর্তি দেখে কখনো ভয়ের উদ্রেক হয়নি, কেন জানিনা কালীর চেহারা আমাকে ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট করতো। এটা বলতে পারব না যে তখন আমার বয়সী অন্যদের কালী মূর্তি সেভাবে আকৃষ্ট করতো কিনা?

ছোট বেলায় ঠাকুরমার সাথে করে গাড়ি করে দক্ষিণেশ্বরে, আদ্যাপীঠে এবং বেলুড়ে গেলেও কালীঘাটে যাওয়া হয়নি। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়িতে যে সব পুজো দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তার মধ্যে অবশ্য কালী পুজো ছিল না। তবে বাড়িতে বিয়ে উপলক্ষে কালী পুজো করার চল রয়েছে, চিরাচরিত পুজো দেখার ধৈর্য্য বা আগ্রহ কোনটাই ছোট বেলায় ছিল না।

স্কুল থেকে একবার আটপুর রাজ বল্লভ হাটে গিয়েছিলাম। ওখানে প্রথম হাড়িকাঠে পাঁঠাবলী দেখেছিলাম, আর দেখেছি বলী নিয়ে মানুষের উন্মাদনা। বলীর, কোন অংশটি কালীর ভাগে গিয়ে গিয়েছিল, সেটাই ঠিক বুঝতে পারিনি। কারন, মাংস তো রান্নার পর আমাদের পেটেই গেছিল। বাকিটা জলে ধুয়ে ফেলে দেওয়া হলো। যে লোকটা বলী দিয়েছিল সে মাথা আর চামড়া নিয়ে চলে গেল।

সম্ভবত পুরোহিত হবে, সে ভোগ নিবেদন করার আছিলায় কালীর মুখের কাছে খাবার নিয়ে ধরছিল আর থালায় ফেরত আনছিল। তা কি প্রকারে বেটি খাচ্ছিল? এই ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকতো না।

যাইহোক কালীর অস্তিত্ব সে ভাবে আর স্মৃতিতে নেই, কারণ কোন কিছুই সময়ের আগে হয় না। আর কালী পুজো কলকাতাতে তো বাজি পুজো, তাই বাজিতেই মন পড়ে থাকতো কালীতে নয়।

এই কালীর প্রতি আমার কোন আগ্রহই ছিল না। তখন ব্যাবসা করি। হঠাৎ একদিন রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। যে কালী আমাকে একটা ফুল দিল। বলা যেতে পারে অর্পণ করলো। নাস্তিক মন এটা বিশ্বাস করাল যে পেট গরম হয়েছে। তাই ভুলভাল স্বপ্ন দেখেছি।

আমার কোম্পানিতে একটা ছেলে সেলসের কাজ করতো। এক দুই দিন বাদে সে দেখি আমার চেম্বারের বাইরে ঘুর ঘুর করছে। হঠাৎ আমি তাকে নিজের অজান্তেই ডেকে বললাম। তুমি তো কালীর ফুলটা নিয়ে এসেছো, দিলে নাতো। এটা যে আমি নিজেই বললাম সেটা বুঝতে পারছিলাম না। যেন ভেতর থেকে কেউ জোর করে বলালো।

ছেলেটির পরিবার কালীঘাটের প্রধান পুরোহিতের কাছে দীক্ষা নিয়েছিল। পুরোহিত মহাশয়ের স্ত্রী ওকে ডেকে বলেছিলেন যে ঐ ফুল আমার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। উনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন। তখন ও বলেছিল আমার মালিক ঘোর নাস্তিক, এসব বিশ্বাস করেন না। মহিলা বলেছিলেন যে উনি ফুলের কথা নিজে ডেকে বলবেন। এই ঘটনায় ছেলেটি অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল এরাকম অলৌকিক ব্যাপার সে আগে কখনো দেখেনি বা শোনেনি। আমাকে প্রশ্ন করেছিল, যে আমি কি করে জানলাম যে ও ফুল নিয়ে এসেছে? উত্তর দিতে পারিনি কারন উত্তর নিজেরই জানা ছিল না।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার এই ঘটনার কিছুদিন পর আমার ব্যাবসা বন্ধ হয়ে যায় আর ছেলেটিরও চাকরি চলে যায়। ব্যবসাটা খুব একটা লাভজনক ছিল না। কিন্তু অনেক গুলো মানুষের অন্ন সংস্থান হতো। এখন বুঝতে পারি ঐ ফুল পাওয়ার জন্যেই এই ব্যবসাটি হয়েছিল।

এরপর অনেকদিন কেটে গেল। গঙ্গার অনেক জল বয়ে গেল। কলকাতার মধ্যেই এক বিখ্যাত কালী মন্দির আছে, যার নাম কালীঘাট, এটি একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু আমার কখনো কালীঘাট যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আর আমি মন্দির টন্দির তেমন যাই না। প্রথমতঃ আমার ভিড় ভালো লাগে না। আর আমার বিশ্বাস যে ঈশ্বর এতো বাধা ধরা গন্ডির মধ্যে থাকতে পারে না, যদি না তাকে ধরে বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু সতীপিঠে কালীকে তন্ত্রের দ্বারা আটকে রাখা হয়েছিল। বা হয়তোবা কালী স্বেচ্ছায় আটক ছিল মানুষের উদ্ধারের জন্য।

হঠাৎ, একদিন ভাই বললো নতুন গাড়ি ডেলিভারি নিতে যাচ্ছে। আমাকে বললো তুইও চল। তখন আমার আত্মা জাগ্রত হয়েছে। মাঝে মাঝে বিভোর হয়ে যাই। বাইরের জগতের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এক স্বর্গীয় অনুভূতি যা মুখে বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

তো গেলাম। গাড়ি ডেলিভারি নেওয়ার পর ঠিক হলো কালীঘাটে পূজা দেওয়া হবে। ঐ প্রথম যাওয়া। সেদিন কোনো এক তিথি ছিল। প্রচুর মানুষের সমাগম। আমরা ফিরে আসছিলাম, হঠাৎ এক দোকানদার বলল বাইরে থেকেও পূজো দেওয়া যায়। সবাই ওতেই রাজি। পূজার প্রস্তুতি চলছিল। হঠাৎ এক সুদর্শন মুন্ডিত মস্তক গেরুয়া বসন পরিহিত ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। কোথা থেকে এলেন ঠিক বলতে পারব না। যেন বাতাস থেকেই বেরিয়ে এলেন।

জিজ্ঞেস করলেন যে আমরা কি করছি? বলা হলো নতুন গাড়ির জন্য পূজা দিতে আসা হয়েছে। বললেন তা বাইরে কেন? আমরা বললাম এই ভিড়ে ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর লাইনেও দাঁড়াতে পারবোনা কারন, হাতে সেই সময় নেই। উনি বললেন আমার সাথে আসুন। আর কেউ কিছু প্রশ্ন করলে কোন উত্তর দেবেন না। আমরা ওনাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

দেখলাম সবাই রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না। একজন, দুজন দর্শনার্থী বলল লাইনে আসুন। কিন্তু কেউই সরাসরি বাধা দিল না। এক অদ্ভুত শক্তি আমাদের ভিতরে নিয়ে গেল। তখন ভেতরে দেবীকে স্নান করানো হচ্ছে। ভিতরটা ভীষন পিছল, পাতা, ফুল ও জল সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। উনি বললেন দেবীকে আলিঙ্গন করুন। সবাই করার পর আমি করতে গিয়ে বুঝলাম এটা কোন মূর্তি নয়। একটা পাথর। বললাম এতো একটা পাথর। উনি বললেন সত্য, এই দেবী পাথরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। সোনার তৈরী মুখ ও হাত বসানো হয়েছে বাইরে থেকে।

এরপর উনি বললেন হাত জোড় করুন। আমি মন্ত্র উচ্চারণ করবো। হাত জোড় করতে যেই মন্ত্র কানে গেল। তৎক্ষণাৎ আমি বিভোর হয়ে গেলাম। আত্ম মগ্ন হয়ে মহা আনন্দে আহ্লাদিত। তখন আমি আর আমিতে নেই। সমগ্র ব্রহ্মান্ড আমার মধ্যে একাত্ম হয়ে গেছে। আর আমি এক বিশাল শীতল সূর্যের ন্যায় তেজদ্বীপ্ত। জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোর ছটা আমার সমস্ত অস্থিত্ত্বে বিরাজমান। ঠিক তখনই বুঝলাম আমি পা নাড়াতে পারছি না। কিভাবে যেন মাটির সাথে আটকে গেছি।

হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন পা জড়িয়ে ধরেছে। এবং সে শরীরের ভিতর প্রবেশ করছে। অদ্ভুত এক আনন্দ হতে লাগলো। মনে হতে লাগলো যেন শরীরের কোন অংশ বহুদিন বিচ্ছিন্ন ছিল, তা আবার ফিরে এসেছে। আনন্দের প্লাবন অন্তরের সূর্যকে যেন প্রদক্ষিণ করছে। এক স্বর্গীয় অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

এরপর মনে হলো কেউ যেন বহু দূর থেকে ডাকছে। ধাক্কা থেকে সম্বীত ফিরল। দেখলাম আমার ভাইয়ের শ্বশুর মশাই বলছেন, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
আমি বললাম আমার পা, কেউ জড়িয়ে ধরেছিলো। উনি বললেন এখানে আবার কে পা জড়িয়ে ধরবে? সাত আট মিনিট পূজো সম্পন্ন হয়ে গেছে। তুমি এভাবেই দাঁড়িয়ে আছো। লজ্জা পেয়ে গেলাম। আর কিছু বলিনি। ভাববে হয়তো মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। দেখলাম যিনি পুজো করছিলেন তিনি চলে গেছেন।

পরে জেনেছি এই সতী পীঠে পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর ডান পায়ের চারটি (মতান্তরে একটি) আঙুল এই তীর্থে পতিত হয়েছিল।

পরে পড়েছি যে এখানে কালী মূর্তি কষ্টিপাথরের তৈরী যার জিভ, দাঁত ও মুকুট সোনার। হাত ও মুণ্ডমালাটিও সোনার। মন্দিরে মধ্যে একটি সিন্দুকে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গটি রক্ষিত আছে। কিন্তু যখন আলিঙ্গন করেছিলাম তখন কি উপায়ে জানলাম যে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গের ব্যাপারে। কারন, ওটাতো একটি সিন্দুকে থাকে। এমনকি ঐ মুন্ডিত মস্তক ভদ্রলোক যে আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল, তিনিও বলেছিলেন মূর্তি নয় পাথরের টুকরোটাই দেবী।

কালীঘাটে আগে কখনো যাইনি এবং কালীঘাট ও কালী মুর্তির বিষয়ে কোন ধারনাই আগে ছিল না। ফলে মাটির মূর্তি না পাথরের টুকরো তা জানা আমার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না। জীবন যখন অলৌকিক তখন ঘটনাক্রম যে অলৌকিক হবে তা বলাই বাহুল্য।

সেদিন রাত্রে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখি কালী বলছে। আমি ফিরে এসেছি, তোমার কাছে থাকব জন্ম জন্মান্তর, পূর্বের মতন। কিছুই বুঝতে পারলাম না। আসলে তখনও বোঝার বা উপলব্ধির সময় আসেনি। কালী কেন আমার কাছে থাকবে? আমি কালীর কে? সময়ের আগে কিছুই হয় না। এরপর যখনই বাড়িতে একলা হতাম মনে হতো কে একজন সাথে রয়েছে। মাঝে মাঝে নূপুরের হাল্কা শব্দ। যেন কোন মেয়ে হাটছে।

প্রথম প্রথম ভাবতাম বাড়িতে বোধহয় কোন ভুতনির উপদ্রব শুরু হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকে মাঝে মাঝেই কালী স্বপ্নে দেখা দিতে শুরু করলো। এরপর অনেক দিন কেটে গিয়েছে। একবার তারাপিঠে যাবার সুযোগ হলো। যদিও ঠিক তারাপিঠে ঘুরতে যাওয়া হয়নি, বলা যেতে পারে তারাপিঠ পথ মধ্যে পড়েছিল। মন্দিরের কোলাহল থেকে বেশ দূরে একটি রিসর্টে উঠেছি। সেদিন বিকেলে একজন লোক এসে বলল মন্দির দর্শনে যাবেন না? আমি বললাম ইচ্ছা নেই। অন্য অনেক অতিথি আছে তাদেরকে বলুন। লোকটি বলল সবাই তো এখানে তাঁরা মাকে দর্শন করতেই আসে। আমি বলেছিলাম এতো কাছে এসেছি, তা তোমাদের তাঁরা মার তো একটা দায়িত্ব আছে। উনি এসে একটু সেবা টেবা করতে পারেন, পা বেশ ব্যাথা ব্যাথা করছে। লোকটি ভাবলো আমি হয়তো ঘোর নাস্তিক, কিছু না বলে চলে গেল।

তখন মুখে একটা ব্রন হয়েছিল। এবং সেটা হাত দিতে দিতে আঁচিলের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিছুতেই পড়ছিল না। সবাই বলছিলো যে কাটাতে হবে। তো রাতের বেলায় মনে হলো কে যেন খুব আদর করে পা টিপে দিচ্ছে। খুব আরাম লাগছিল। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ব্যাথা গায়েব আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মুখের আঁচিলটা খুলে পড়ে রয়েছে বিছানায়। এবং মুখে কোন দাগ নেই। বুঝলাম এ ঐ কালীরই কাজ।

আমার জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত অলৌকিক। অনেকেই এইসব বিশ্বাস করে না। এই লেখা নিজের উপলব্ধি। যা সত্য তাই লিখি। কে বিশ্বাস করবে বা না করবে। তাতে আমার কোন আগ্রহ নেই। যে বিশ্বাস করবে সে ঈশ্বরের করুনার যোগ্য। মানুষকে ঈশ্বর অবশ্যই সহযোগিতা করেন যা অলৌকিক, বিশ্বাসী মানুষের কাছে বহু প্রমাণ রয়েছে। যদি সে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে তখনই তা ঘটে নচেৎ নয়।

কালী বহুদিন যাবৎ শরীরে রয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য যে কি, তার কোনো কিছুই বুঝতে পারিনি। মাঝে মধ্যে রাত্রে মিষ্টি গন্ধে ঘর মঁ মঁ করে, বুঝি কেউ আমাকে কামনা করছে। একদিন দিলাম আচ্ছা করে ঝাড়, এসবের মানে কি? কিছুদিন সব চুপচাপ তারপর দেখি নখ দিয়ে পিঠে ও ঘাড়ে আঁচড়ে দিয়েছে, পাত্তা না দেওয়ায়।

আমি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, ফলে শরীরের ভিতরে কালীর উপস্থিতি টের পেতে শুরু করলাম। মনে হতে লাগলো যে কালী আলাদা বা স্বতন্ত্র নয় যেন আমার শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কালীর প্রতি আস্তে আস্তে মন নরম হতে শুরু করল। তখন সময় অসময়ে যোগ শক্তিবলে ওকে শরীর থেকে বাইরে প্রকট করতাম। এবং সেই সময় থেকেই ওর সাথে কথা বলা শুরু। একা থাকতাম আর নিজের মনে বকবক করে যেতাম। আর ও আমার আশে পাশে ঘুরে বেড়াতো। আর, আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মাঝে মাঝে হেঁসে উঠতো। কতোদিন ওকে আমার কাঁধে তুলে ঘুরেছি তার কোনো হিসেব নেই।

আমি শুয়ে থাকলে আমার পিঠের উপর ও শুয়ে থাকতো। আর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে বুকের উপর। আর ও কোলে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার বকবকানি শুনতো।

একবার খুব বিপদে পড়লাম কিছুতেই বিপদ কাটে না। তখন ভাবছিলাম যে কি করা যায়। আমার আত্মা একটা পথ দেখিয়ে দিল। তখন আত্মার জাগরন ঘটে গেছে। ফলে ধ্যান করতে করতে সেই বিশেষ সিদ্ধ যোগ ক্রিয়া সম্পন্ন করতেই, সব বিপদ অদৃশ্য হয়ে গেল। সেটা ছিল এক মহাশক্তি যজ্ঞ। ঐ ঘটনা আমাকে বুঝিয়ে দিল যে কালীই হলো আমার কুন্ডোলিনী শক্তি। অর্থাৎ, ওকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। প্রতিটি পুরুষের অন্তরের নারী বা স্ত্রী যে পুরুষের কুন্ডোলিনী শক্তি, এ বিষয়ে পরবর্তী কোন প্রবন্ধে বলা যাবে।

সংসারে এমন কিছু সংকট থাকে যা নারী বা স্ত্রী শক্তি ছাড়া মেটানো সম্ভব নয়। যেমন ছন্নছাড়া পুরুষকে পথ দেখায় নারী, অর্থাৎ স্ত্রী হলো পুরুষের অনুপ্রেরণা বা শক্তি। সেই সংসার সৃষ্টি করে তার প্রাননাথের সাথে। মূর্খ আমি, তখনও কালী আমার কে? এই বোধগম্য হয়নি। ফলে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হলো।

যাইহোক এরপর কোথাও কোন কাজে গিয়ে বিলম্ব হলে, বা সমস্যা হলে বলতাম হারামজাদী কালী এসব হচ্ছেটা কি? আমার সাথে তুই মজা করছিস? আর সঙ্গে সঙ্গে তুর্কি নাচন শুরু হতো। সেই সমস্ত বিলম্বিত কাজ নিমেষে সমাধা হয়ে যেতো।

একবার বাড়ি সংক্রান্ত একটি মামলায় বিচারক একজন আধিকারিকের স্বাক্ষর চেয়ে বসলেন। বাবার নামে বাড়ি, ফলে বাবাকে নিয়ে পুরসভার এক অফিসে যেতে হলো। সরকারি জায়গায় কোন কাজ তো সঙ্গে সঙ্গে হয় না। এ বলে এখন নয় বিকালে আসুন, কাল আসুন। বাবা অসুস্থ, তাকে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা এদিকে ওদিকে করতে হচ্ছে। তখন কালীকে স্মরণ করে বললাম কালী হচ্ছেটা কি? তুই সাথে থাকতে, এইসব ফালতু কাজ আমার সাজে?

পনেরো মিনিটের মধ্যে মা ফোন করে জানালেন যে স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই, স্বয়ং বিচারক জানিয়েছেন। হাঁফ ছেড়ে বাবাকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। কালী বহু ক্ষেত্রে নিজের থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

এরমধ্যে একদিন ধ্যানে শুনলাম একটা মেয়েলি গলায় কে যেন বলছে। ঈশ্বর শুধু পুরুষ নয় সাথে একটা মেয়ে রয়েছে। সে তোমার অর্ধাঙ্গিনী, আমি নাছোড়বান্দা কারন, আমি তা দেখতে চাই। প্রমাণ ছাড়া সত্য বলে কিছু মানতে পারি না। দেখে মেনে নিলাম যে একজন দেবীর অস্তিত্ব, আমার বাম পাশে।

সে দেখালো যে আমার আত্মার চেতনায় আমি স্বয়ং অধিষ্ঠান করছি ঐ মেয়েটির সাথে। বুঝলাম আমি পরমাত্মা এবং আমার মধ্যেই নিরাকার ব্রহ্মের বা ব্রহ্ম দ্বায়ের অবস্থান। এ তথ্য জানার পর কালী চাপ দিতে শুরু করলো ওকে স্ত্রী বলে স্বীকৃতি দিতে।

আমার একটা অলৌকিক শক্তি আছে, যার দ্বারা যেকোন মেয়ে আমাকে দেখে বশীভূত হয়ে যায়। এবং সেটা ভীষণ শক্তিশালী, মানে কোন উপায়ে এই সম্পর্ককে ভেদ করা যায় না বা ইতি টানা যায় না। এর ফলে, আমার আত্মা বান্ধবীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু হলো।

কিন্তু, কোনো সম্পর্কই এগোতে পারে না। কেউ অবচেতন মনে হুঁশিয়ারি দেয়, যে এগোলে এই হবে ঐ হবে। পরে বুঝলাম এ হুঁশিয়ারি আর কেউ দিচ্ছে না। এইসব ওই কালীরই কীর্তি।

এই আত্মা বান্ধবী বিষয়টির একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমার আত্মার আনবিক রুপ একটি বড় সূর্যের মতো। বিভিন্ন সময়ে তেজদ্বিপ্ত হওয়ার ফলে আমার আত্মা ধনাত্মক শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে কালী বা সতী বা নারী প্রকৃতিকে। আর ঋনাত্মক শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে এই আত্মা বান্ধবীদের উৎপত্তি।

ফলে আত্মা বান্ধবীরা অধিকাংশই বিভিন্ন দুষ্কৃতীকারিদের সাথে লিপ্ত। আমার বাস্তব জীবনে এদের আমি আমার শত্রুদের সাথেই দেখেছি। এর কারন হিসেবে বলা যায় যে এরা দুষ্কৃতীকারিদের বিনাশ এর জন্যে আমার সৃষ্ট অনুঘটক। এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাকে বিভিন্ন ভাবে নিপীড়ন করে।

এ ভাবে এক আত্মা বান্ধবী জীবনে এসে উপস্থিত হলো। যে আসলে এক মহা শয়তানি শক্তি। ফলে যত শয়তান পৃথিবীতে থাকতে পারে সব তার সাথে এসে যুক্ত হলো। মহাভারতের সময়কালে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। মগধের অসুর সম্রাট জরাসন্ধের পতাকা তলে সমস্ত শয়তান এসে ভিড়েছিল। কিন্তু, একথা ভুললে চলবে না যে মহাভারতের মহা যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছিল? এবং এবারেও তার অন্যথা হবে না। অর্থাৎ, দুষ্কৃতীর বিনাশ। জরাসন্ধ কিন্তু কৃষ্ণের আত্মীয় ছিল। দুই মামাতো ভগ্নির স্বামী।

কালী আমাকে পথ দেখিয়ে দিল, যে কি করতে হবে? কারন শয়তানি শক্তিকে একমাত্র পরমেশ্বর বিনাশ করতে পারে। কারন, সব কিছুই তারই সৃষ্টি। আমি আর কালী এক না হতে পারলে, পরমব্রহ্ম জাগ্রত হবে না। অর্থাৎ আমি আর কালী একত্রিত হলে আমি পরমাত্মা বা পরমেশ্বর বা পরমপুরুষ বা পরমব্রহ্ম রুপে আবির্ভূত হই। এবং আমার শরীরে সেই চিহ্ন বা শক্তি জাগ্রত হয়।

এরপর বুঝতে পারলাম কি করতে হবে? কালীকে বললাম তোকে বিবাহ করবো, কিন্তু চিরাচরিত রুপে নয়। আমার সামনে তোকে নতুন রূপে আসতে হবে। আমি ওর ছবি খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্তু কোন ছবি পছন্দ হয় না। ধ্যানে ওর একটা রুপ কল্পনা করে ওর সিঁথিতে সিঁদুর পড়িয়ে দিলাম। আর গলায় পড়িয়ে দিলাম আমার গলার মালা। দুই পাশের বিন্যস্ত কেশরাশী ফুলে সাজিয়ে দিলাম। আর অনুভব করলাম ওর অস্তিত্ব আমার আঙ্গুলের স্পর্শে।

পরদিন ঐ রুপে একটা ছবি সামনে চলে এল। কিন্তু এই ছবিটা আমি ধ্যানেই দেখেছি। এরপর কালীকে দিয়ে ঐ দুষ্ট মেয়েটিকে বা শয়তানি শক্তিকে প্রতিস্থাপন করলাম।

যখন শরীরের কোন স্থানে ব্যাথা অনুভব করি। ওকে ডাকি বলি কিরে তুই তো তোর স্বামীর কোন খেয়ালই রাখিস না। একটু সেবা টেবা কর, তবেই তো পুণ্য অর্জন হবে। তার পর ও টিপে দেয় আর মুহূর্তে শরীরের সমস্ত বেদনা নিমেষে গায়েব হয়ে যায়। এ সমস্ত সামান্য ব্যাথা আমি যে সারাতে পারি না এমন কথা নয়। কিন্তু ওর ছোঁয়া আমার বড় ভালো লাগে।

কতোদিন ও আমার সাথে শুয়ে বসে অবসরে কাটায়। আর আমি ওকে সাজাই আমার মনের মতো করে। আমাদের এই প্রনয় কিন্তু লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। ভারতে মোট ছয়জন মানবী দিব্য দৃষ্টিতে তা দেখতে পায়। সে অন্য গল্প।

আগে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে বুফেতে খেতে হাজির হতাম, ওটা আসলে যারা খাওয়ার ব্যাপারে রাক্ষস, তাদের উপযুক্ত স্থান। মানে এখনও আমার খাওয়া দেখলে অনেকেই লজ্জা পাবে। আগে ৭৫০ মিলি লিটার মাপের পাত্র ভর্তি ভাত খেতাম। কালী আমার মধ্যে অনেকদিন ধরে রয়েছে, কিন্তু আগে ও অল্পতে সন্তুষ্ট ছিল। কারন হয়তো বিভিন্ন মন্দিরে ভোগ পেতো অর্থাৎ ওকে যে ভোগ নিবেদন করা হতো। এখন আমার সাথে ওর রিউনিয়ন বা পুনর্মিলন হয়েছে। অর্থাৎ, স্ত্রী বা পত্নী রুপে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর সমস্ত স্বামীকে তো স্ত্রীর ভরণ পোষনের দায়িত্ব নিতে হয়। ফলে যেদিন ওকে স্বীকৃতি দিলাম সেদিন থেকে আমার খাওয়ার পরিমাণটা হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। আগে ৭৫০ মিলি লিটার পরিমাপের ভাত খেতাম আর এখন ১২০০ মিলি লিটার হয়ে গিয়েছে। আমার ঐ ৭৫০ মিলি আর ওর ৪৫০ মিলি।

আগে কোন ভাবেই ৭৫০ মিলির উপর ভাত খেতে পারতাম না, অস্বস্তি অনুভব করতাম। কিন্তু যেদিন কালী আমার সাথে বন্ধনে যুক্ত হলো, সেদিন থেকে কি উপায়ে ভাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেল তা সত্যিই এক রহস্যের ব্যাপার।

আগে একা থাকতাম, তখন খাওয়া দাওয়ার ঠিক ঠিকানা ছিল না, এমনকি সামর্থ্যও ছিল না। ওকে বললাম, এই যে তুই আমার সাথে জুড়লি, এখন তবে খাদ্যের সংস্থান কর। শত্রুরা তো আমার ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে রেখেছে। ও কলকাঠি নাড়িয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মেয়েদের এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা, এই জন্য ওদের অন্নপূর্ণা বলে। মা এখন কাছে রয়েছে, বয়স হলেও কিছু রান্না করে। অনেক দিন পর কিছু ভালো মন্দ জুটছে, আর তা আমি আর কালী খাচ্ছি চেটে পুটে।

আর, আগে তো মানুষ ওকে খেতেই দিতো না। নিজের চোখে দেখেছি খাবার মুখের সামনে ধরছে আর তারপর আবার থালায় ফিরিয়ে নিচ্ছে। খাবার নিয়ে এই প্রতারনার কোন মানে হয়? কারণ সবটাই খাচ্ছে মানুষ। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি ঈশ্বরকে উৎসর্গ করা খাদ্যের ওজন এক মাইক্রোগ্রামও কমে না। তবে ঈশ্বরের ভাগে কি যায়?

আমার পিছন থেকে শত্রুরা হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ দিয়ে ফুটিয়ে দেয়, আর এই প্রক্রিয়া প্রায় ২২-২৫ বছর ধরে চলছে। পিছনে তো আর চোখ হয় না, তাই এক গুচ্ছ মেয়ের ভাবনা করেছিলাম। যারা আমার নিজের হবে এবং আমার শরীরের পিছনে আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু সেই মেয়ের দল সৃষ্টি হলেও তারা তাদের কাজে আগ্রহী নয়। কলি যুগের মেয়ে, নিজের নিজের ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত। তাই কালীকে বললাম তুই আমায় পিছন থেকে রক্ষা করবি। আর সামনে কোন আততায়ী তো আসে না, কারণ এলে অবধারিত মৃত্যু। এই রহস্যটি আমার শত্রুরা বিলক্ষণ জানে।

ফলও মিললো হাতে নাতে, আক্রমণ কমে গেল। কিন্তু কলি যুগের শত্রু অত সহজে হার মানে? ফলে শুরু হলো ধারাবাহিক পরিকল্পিত আক্রমণ। বাজারে এক মারোয়াড়ী শয়তান অজান্তে পিছনে ছুঁচ ফুটিয়ে দিলো। রোজ বেরোনোর আগে কালীকে বলে নিতাম, যে তুই তৈরী থাকিস কিন্তু। সেদিন আর বলা হয়নি।

জানি না কি ঢুকিয়েছে শরীরে, একটু শরীর খারাপ করল তাও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য। এতেই মাথা গেল গরম হয়ে। কালীকে বললাম তুই কোন কাজের নস। তোকে আমি আমার আত্মাতে ফিরিয়ে নেবো, আর তোর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। ও জানে যে ও আমার থেকে সৃষ্টি হয়েছে, ফলে আমার মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া ভবিতব্য। কিন্তু তা তো সময়ের আগে হতে পারে না। ওর অভিমান হয়ে গেল, সেদিন দুপুরে আর খেলোই না। আমার ১২০০ মিলি লিটার পরিমাপের ভাত ৭০০ হয়ে গেল। বুঝলাম ও খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ওকে ছাড়া খাই কি করে? বললাম রাগ করিস না। আমি যেটুকু খেয়েছি তা হবে আধা আধি। আর তুই যেমনটা রয়েছিস তেমনি থাকবি, তোর অমর্যাদা আর কখনো হবে না। আর ও করবে আমার উপর রাগ, তাও আবার হয় না কি? তারপর থেকে আবার সব স্বাভাবিক।

ও জানে, এ যতই লাফাক কিন্তু মতি কিন্তু একজনে, আর সে হল কালিকা। আর মানব অবতারে জন্ম এবং আমার কাছে ওর আগমন তো খেলার ছলে হয়নি। এর পিছনে বিশেষ কারণ আছে।

এখন পৃথিবীর কোন মন্দিরে বা কোন স্থানে কালীর আর দ্বিতীয় কোন অস্তিত্ব নেই। এমনকি ওর সমস্ত অবতারদের ও কোন আলাদা অস্তিত্ব নেই। যা আছে সব আমার অন্তরে।

এই প্রবন্ধটি আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। যা নিজের চোখে দেখা নিজের শরীর দিয়ে উপলব্ধি করা। হতে পারে কারোর ভালো নাও লাগতে পারে। সবার মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। অযথা আমাকে উত্তেজিত করে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না।

প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি অনুসরণ বা follow করুন ।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

One thought on “কালী এবং আমি

Leave a Reply