মোক্ষলাভে কি জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে সত্যিই মুক্তি পাওয়া যায়?

তন্ত্রে বলা হয়েছে,

“মকার-পঞ্চকং কৃত্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে”
পঞ্চ “ম” কার সাধনায় সাধকের পুনর্জন্ম হয় না। কারণ,

এবমভ্যস্যমানস্ত অহন্যহনি পার্বতী
জরামরনদুঃখাদ্যৈম্মু চ্যতে ভববন্ধনাৎ।।
– শাক্তানন্দ তরঙ্গিনী

উক্ত সাধনা সম্পন্ন হলে সাধক জরা, মরন, দুঃখ, ভব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে। অর্থাৎ, সিদ্ধি লাভ হলে মুক্তি ঘটে।
সাধারণভাবে ‘মোক্ষ’ শব্দের অর্থ দুঃখ বা বেদনাদায়ক অবস্থা থেকে চিরদিনের নিষ্কৃতি। এই অবস্থা লাভে জীব শান্তি ও পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই চার্বাক ব্যতীত ভারতীয় দর্শনের আস্তিক-নাস্তিক সকল সম্প্রদায় মোক্ষলাভের জন্য সচেষ্ট হতে আহবান করে। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ-এই চারটিকে পুরুষার্থ বলা হয়।
তবে অধিকাংশ ভারতীয়দের মতে, মোক্ষ হচ্ছে ‘পরম পুরুষার্থ’ অর্থাৎ মোক্ষলাভ হলে আর কিছুই কামনার থাকে না, আমাদের সব প্রয়োজনের অবসান ঘটে।

জীবনকে কেন দুঃখময় বলা হয়েছে? এর কারণ হিসেবে বলা যায়, একটি জীবনের কথা বলা হয়নি। বদলে আত্মার অগনিত জীবনের কথা বলা হয়েছে। আর জীবনে আনন্দ মানে অর্থের প্রাচুর্যতা নয়। বরং মানসিক শান্তি, সমৃদ্ধি এবং চেতনার উন্মেষ। যা স্থূল ভাবনায় সম্ভব নয়। আর স্থূল থেকে সূক্ষ্ম হতে বহু জন্ম কেটে যায়।

আত্মা বারে বারে পৃথিবীতে ফিরে আসে জন্ম গ্রহণের মাধ্যমে। যতক্ষণ না সে তার জীবন চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে। এই জীবন চক্র হলো জন্ম ও মৃত্যুর চক্র। আত্মা এই চক্রে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে।

মানব জীবন চারটি অনুঘটকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, বা বলা যেতে পারে যে পুনর্জন্ম হয় চারটি অনুঘটকের কারণে। সেগুলো হলো জ্ঞান, কর্ম, ইচ্ছা এবং ভক্তি।

যতক্ষণ না পর্যন্ত উপরোক্ত অনুঘটক গুলির পূর্তি বা পূরন না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মা জন্ম গ্রহণের মাধ্যমে জন্ম মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ থাকবে।



যেমন জ্ঞান লাভ সম্পূর্ন না হলে আত্মাকে বারংবার ফিরে আসতে হয় জ্ঞান সম্পূর্ন করার জন্য। কর্মের ঋণের ও চ্যুতির কারনেই হয় পুনর্জন্ম। এমনকি সম্পর্ক পর্যন্ত, অর্থাৎ আত্মা যে পিতা ও মাতার কাছে জন্ম গ্রহণ করে, তা তার পূর্ব পরিচিত। দুই পক্ষের ঋণ এই সম্পর্কের আকার ও প্রকার ঠিক করে। বিবাহের সম্পর্ক পর্যন্ত আত্মার ঋণের কারনেই হয়।

এখানে ইচ্ছাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ পূর্ব জন্মে অপূর্ণ ইচ্ছার পূর্নতার চাহিদাও কিন্তু পরবর্তী জন্ম কে পরিকল্পিত করে। ভক্তি মানে হলো ঈশ্বরে বিশ্বাস। কলি যুগের মানুষের এই বিশ্বাসটাই নেই, ফলে পূন্যও নেই। তাই কলি যুগে মুক্তি লাভ করা মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা।

যখন কোন মানুষের এই উপরোক্ত অনুঘটকের পূর্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় হয় তখন সে সাধনা শুরু করে বা এবং তার অন্তরে আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনার সুত্রপাত হয়।

আবার ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ-এই চারটিকে পুরুষার্থ বলা হয়। জীবনের পরিপুষ্টি ও পরিপূর্ণতার জন্য এই চারটিই একান্ত আবশ্যক।

জৈন মতে, কামনা-বাসনা ও ভোগ-লালসার কারণে জীব কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়। কর্মবন্ধন হলো জড়ের বন্ধন তথা পদগুলের বন্ধন। কর্ম-পদগুলের কারণেই জীবের বদ্ধাবস্থা লাভ হয়। এই বদ্ধাবস্থায় আত্মার স্বরূপ আবৃত থাকে। সুতরাং এই বদ্ধাবস্থা থেকে মুক্তি তথা পদগুলের বিযুক্তিই হচ্ছে মোক্ষ। চিত্ত শুদ্ধির দ্বারা ত্রিরত্ন অর্থাৎ সম্যক্ দর্শন, সম্যক্ জ্ঞান ও সম্যক্ চরিত্রের মাধ্যমে আত্মার মোক্ষপ্রাপ্তি হয়। এরূপ অবস্থায় আত্মা তার স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয় অর্থাৎ অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত শক্তি, অনন্ত দর্শন ও অনন্ত আনন্দ লাভ করে এবং সঞ্চিত ও সঞ্চীয়মান কর্ম-পদগুল বন্ধন বিচ্ছিন্ন করে। এই ‘পদগুল’ বন্ধন বিচ্ছিন্ন করার সাধনাই হলো মোক্ষসাধনা এবং ‘পদগুল’ বন্ধন-মোচনই মুক্তি। মোক্ষ প্রাপ্ত আত্মা অনাবিল ও অনন্ত সুখের অধিকারী হয়।

বৌদ্ধদর্শনে জগৎ দুঃখময় হলেও দুঃখের নিবৃত্তি সম্ভব। এই দুঃখের নিরোধকেই নির্বাণ বলে অভিহিত করা হয়। নির্বাণ ও মোক্ষ সমার্থক। গৌতমবুদ্ধ অবিদ্যাকেই দুঃখের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে অষ্টাঙ্গিক মার্গ অর্থাৎ সম্যক্ দৃষ্টি, সম্যক্ সংকল্প, সম্যক্ বাক্, সম্যক্ কর্মান্ত, সম্যক্ আজীব, সম্যক্ ব্যায়াম, সম্যক্ স্মৃতি ও সম্যক্ সমাধির মাধ্যমেই নির্বাণ সম্ভব হয়। নির্বাণ দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি। এরূপ অবস্থায় জীবের দুঃখ, কামনা-বাসনার অবলুপ্তি ঘটে, জরা-মরণ রহিত হয় এবং পুনর্জন্মের সম্ভাবনা থাকে না। তাই নির্বাণ হচ্ছে সত্তার পূর্ণ অবলুপ্তি।

“তস্মদাসক্তঃ সততম্‌ কার্যম্‌ কর্ম সমাচর।
অসক্তো হ্যাচরণকর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।।”

অতএব, কর্মের ফলাফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে, একজন কর্ত্তব্য হিসেবে কর্ম সম্পাদন করবেন, যেহেতু আসক্তি বিনা কর্মেই একজন পরম বা ঈশ্বরকে লাভ করেন।

কর্মের ঋণ হলে জন্ম হতেই হবে কারন ঋণ শোধ করতে হয়। জ্ঞান বলতে স্কুল বা কলেজ অর্জিত জ্ঞান নয় বরং ব্রহ্ম জ্ঞান। সিদ্ধি তখনই হয় যখন অনুঘটক গুলো পূর্ণতা পায়। সিদ্ধি থাকলে সাধকের আর পরজন্ম বা পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে না। এমনকি সে তার ভবিষ্যত জীবন দেখতে পায়। যেমন অনেকেই সাধারণ ভাবে ঈশ্বরকে বা কোন সাধককে সন্তান রুপে কামনা করে।

তখন সাধক বা ঈশ্বর ঐ কামনাকারী ব্যাক্তির ভবিষ্যতে সন্তান হিসেবে নিজেকে দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পায়। সিদ্ধিতে সাধকের একটি বিশেষ শক্তি লাভ হয়, যার দ্বারা কোন কিছু গ্রহন বা বর্জন করা যায়। তখন সাধক এবং ঈশ্বর পরবর্তী জন্ম বা অবতরণ ঐ বিশেষ শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে পারে।

একদিন এক অপূর্ব সুন্দরী বিদেশি রমনীকে দেখে মনে হলো সে সম্ভবত আমার থেকে সৃষ্ট এক আত্মা বান্ধবী। প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য যারা আমার আত্মা বান্ধবী হয়, তারা আমার উপস্থিতি হাজার হাজার মাইল দুর থেকে হলেও টের পেয়ে যায়। মেয়েটি আমাকে তার সন্তান হিসেবে কামনা করছিল। আমি তখন দিব্য দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে তার সন্তানের কি রুপ হবে দেখতে পেলাম। কিন্তু, আমারা সত্য যুগে প্রবেশ করতে চলেছি। ফলে এখন জন্মান্তর আর হবে না। জন্মান্তর হলে সত্য যুগে প্রবেশ বাধা প্রাপ্ত হবে। তাহলে মহা প্রলয় শুরু হয়ে যাবে। তাই আমি মেয়েটির শুধু নয় আরো যে সমস্ত প্রস্তাব বা কামনা ছিল সব নাকচ করে দিয়েছি।

প্রবন্ধটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি লাইক দিয়ে অনুসরণ বা follow করুন।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।



Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply