সাধনা শুরু হয় অজান্তে

মানুষের জীবনটাই সাধনার অঙ্গ বা বলা যেতে পারে জীবনই হলো সাধনা। প্রথমে তা শুরু হয় ভোগ সাধনা আর তারপর ত্যাগ। কিন্তু ভোগ সাধনার প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য কি?

প্রথমে জানা যাক সাধনা কি ভাবে শুরু হয়? পুরুষ আত্মা যখন তার স্ত্রী সত্ত্বার বহিষ্কার করে তখন সাধনার সুত্রপাত হয়। ঐ স্ত্রী সত্ত্বাকে বলে আত্মা বান্ধবী। এই আত্মা বান্ধবী মানবী রুপে আসে বা জন্ম গ্রহণ করে, যখন পুরুষ আত্মা ধরায় অবতীর্ণ হয়।

সেই হয় জন্ম জন্মান্তরের স্ত্রী। ভোগ সাধনায় মৈথুন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারন তার মাধ্যমেই সন্তান সন্ততী জন্ম গ্রহণ করে। আর এই সন্তানরা কিন্তু সবই পুর্ব বা উত্তর পুরুষ। তাদেরকেও মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। কারন এদের মধ্যে অনেকের কাছে কর্মের ঋণ থাকে। এই ভোগ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরুষ স্ব-ইচ্ছায় মৈথুন চক্র থেকে নিজেকে নিসকৃতি দেয়। এর জন্যে পূর্ব জন্মের পূন্যের কারনে প্রাপ্ত জ্ঞান তার কাজে আসে। এবং তার সাথে অন্যের কাছে করা কর্ম ঋণের পরিসমাপ্তী ঘটে। এবং তখনই শেষ হয় ভোগ সাধনা।

ভোগ সাধনার শেষে তন্ত্র সাধনা বা তান্ত্রিক আচারের শুরু হয়। এবং এই প্রক্রিয়া শুরু হয় নিজের অজান্তে। কারন তন্ত্র কথার মধ্যে রয়েছে তন অর্থাৎ দেহ আর ত্র অর্থাৎ পথ। মানে বলা যেতে পারে তন্ত্র মানে দৈহিক আচার বা দেহে সাধনা। এবং সেই সাধনের সুত্রপাত ঘটে বা সাধন প্রক্রিয়া শুরু হয়।



এমনকি সাধন পথ বেছে নেওয়া পর্যন্ত নিজের হাতে থাকে না। বলা যেতে পারে গন্তব্য আগে থেকেই স্থির হয়ে থাকে। এই জন্যই বলা হয় কে কোন সাধনা করবে তার ভবিষ্যৎবাণী অনেক আগেই হয়ে যায়।

তন্ত্রে পঞ্চ ‘ম’ কার সাধনাতে পাঁচটি উপকরণ রয়েছে তার প্রত্যেকটির নাম শুরু হয়েছে ‘ম’ দিয়ে। সেগুলো হলো মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। মদ্য হলো শ্রেষ্ঠ পানীয়, যা ভোগ ও ত্যাগ সাধনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপকরণ। মাংস হলো অন্যতম শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট খাদ্য। মৎসও শ্রেষ্ঠ খাদ্যের মধ্যে অন্যতম। মাংস আর মৎস ছাড়া ভোগ ও ত্যাগ সাধনা হয় না। মুদ্রা হলো শস্য, জীবন অতিবাহিত করতে শস্যের ব্যবহার অপরিহার্য। আর মৈথুন হলো জীবনের ভোগ সাধনার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। শারীরিক বা স্থূল মৈথুনের ব্যবহার থাকে ভোগ সাধনায় কিন্তু ত্যাগ সাধনায় তা সূক্ষ্ম রুপ ধারন করে।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।


পঞ্চ ম-কার সম্পর্কে বিভিন্ন পুস্তকে যে ধারণা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই ভুলে ভর্তি। এই সাধনা প্রথমে স্থূল শরীরে হয়। আর এর প্রক্রিয়া উর্ধমুখী। কিন্তু স্থূল শরীর শুধু নয় স্থূল জগতের সবকিছু নিম্নমূখী। একমাত্র যে ঐ সাধনার জন্য প্রস্তুত সেই শুধু উর্ধমুখী যেতে পারে।

যেমন মদ্য, পঞ্চ ম-কারে মদ্য হলো স্থূল উপকরণ মদ। আর এর প্রতি উচ্ছ্বাস হলো ভোগ সাধনার অঙ্গ। তবে কি এটা বলা যাবে যে যারা মাতাল তারাই সাধক হওয়ার উপযুক্ত? না একেবারেই নয়। মদে যার চেতনা বিলুপ্ত হয় না সেই ব্যক্তি যোগ্য।

যারা মাতাল তাদের সাধনাই হওয়ার নয়, কারণ তাদের ভোগ প্রক্রিয়া শেষ হয়নি এমনকি ঋণও শোধ হয়নি।

আমি তখন একটি ডাইরেক্ট সেলস কোম্পানিতে কর্মরত। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অব্দি অমানুষিক পরিশ্রম। বাড়ি থেকে বের হতাম সকাল সাতটায় আর ফিরতে ফিরতে রাত দশটা এগারোটা বেজে যেতো।

তখন চেনা জানা এক ভদ্রলোক বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি জ্যোতিষ চর্চা করতেন। তিনি আমার হাত দেখে মা কে বললেন যে আমার কিছু সমস্যা রয়েছে। তার প্রতিকার করার জন্যে সারাদিন উপবাস থেকে রাতে হবিষ্যান্ন ভক্ষন করতে হবে।

যেদিন সেটা করার জন্য ঠিক হলো, সেদিন আমি যেখানে চাকরি করতাম সেখানে সেলস মিট পড়ে গেল। আমার চাকরিতে কোন ছুটির দিন বলে কিছু ছিল না। সেলস মিটে সবাই আকন্ঠ ভরে মদ্য পান করতো। আকন্ঠ ভরে মদ্য পান আমি কখনো করিনি তা নয়। বহু বার করেছি কিন্তু যাকে বলে মাতাল হওয়া তা কখনোই হইনি।

এরকম বহু বার ঘটেছে যে আমি দোকানে গিয়ে বলেছি যে কেন নেশা ধরছে না? জালি মদ বিক্রি করছেন কি? তারা তাদের বিল দেখিয়ে আমাকে ক্ষান্ত করেছে।

সবার মনে শঙ্কা ছিল যে আমি উপবাস প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারব কিনা? কিন্তু যখন রেস্টুরেন্টে আকন্ঠ ভরে মদ পান চলছিল। সাথে ছিল বিরিয়ানি আর চাইনিজ। তখন আমি শুধু জল নিয়ে বসেছিলাম। কোন জোরাজুরি বা আবেদন আমার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন করতে পারেনি। এক ফোঁটা মদ কেন সফট ড্রিংকসও পান করিনি। এক টুকরো মাংস বা মাছ গ্রহণ করিনি।

সেলসের কলিগ ও ম্যানেজাররা আমার মানসিক শক্তি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। যেটা তখন একটি গল্পে পরিনত হয়েছিল। তখন কি জানতাম যে স্থূলাকারে আমার পঞ্চ ম-কার সাধনার শুরু হয়ে গিয়েছে?

ব্রহ্ম জ্ঞান একদিনে আসে না। কিন্তু কোথাও একটা শুরু হয়। তারপর একে একে পঞ্চ ম-কারের প্রতিটি ‘ম’ পেরিয়ে এসেছি। আজ তাই কুন্ডোলিনীর প্রতিটি চক্রের আলাদা আলাদা সিদ্ধির আভাস পাই প্রতি ক্ষনে।

স্থূল পঞ্চ ম-কারের পরেই ষড়ঙ্গী সাধন সম্ভব। আর তাই শুধু কালী নয় তার নয় মহাবিদ্যা এবং মহামায়া আমার সাধন সঙ্গী। তারা একে আমার মধ্যে এসেছে। আর আমি জেনেছি ব্রহ্মান্ডের রহস্য, দেখেছি পরমেশ্বরের শক্তিকে।

ব্লগ ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের অনুসরণ করুন।


Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply