মন্ত্রের উৎস ও প্রোয়োগ

মন্ত্র হলো এক প্রকার অক্ষর বা শব্দ বা শব্দবন্ধ শব্দ গুচ্ছ। বা কতকগুলি অক্ষরের সমষ্টি হতে পারে। বা কতকগুলি শব্দের সমষ্টি হতে পারে। মন্ত্র কখনো বিচ্ছিন্ন শব্দবন্ধ হতে পারে। বা কোন বাক্য হতে পারে। আবার শ্লোক বা ছড়াও হতে পারে।

তবে যাই হউক না কেন এর উচ্চারণে অনুরনন সৃষ্টি হতে হবে। যদিও মানসিক মন্ত্রে অনুরনন ছাড়াই মন্ত্র গঠন হতে দেখা যায়। এবং এই অনুরনন সাধারণত বীজ প্রোয়োগে প্রোয়োগ কর্তার শরীরের মধ্যে সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মন্ত্রের ব্যবহার বিভিন্ন, তবে এর প্রয়োগের ফলাফল উচ্চারণের উপর নির্ভর করে। ভূল উচ্চারণে মন্ত্র আর কাকের ডাকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

অনেকেই মনে করেন মন্ত্র টন্ত্র কোন কাজের নয়। কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ন ভুল। আমাদের জীবনে, পূজো পার্বনে, যে সমস্ত মন্ত্রের ব্যবহার হয়ে থাকে। তার বেশিরভাগই হলো বেদের মন্ত্র। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই সমস্ত মন্ত্র একে অপরের সাথে মিশে নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করেছে। সাথে শব্দের উচ্চারণও বদলে গেছে।

ফল স্বরূপ এখন ব্যবহৃত বেশিরভাগ মন্ত্রেরই প্রোয়োগে ফল লাভ শূন্য। আর যারা ব্যবহারকারী এবিষয়ে তাদের অবদান কিন্তু কম নয়। এ প্রসঙ্গে সকলেই অল্প বিস্তর অবগত। যেমন ধরা যাক বাড়ির পুজো।


সেখানে অনেকেই পুরোহিত মশাইকে সময়ের অভাবে অতি দ্রুত বা সংক্ষিপ্ত সমাচারে পূজো করতে বলেন। আবার যেদিন কোন বিশেষ পূজো থাকে সেদিন পুরোহিত মশাইরা যে কি মন্ত্র উচ্চারণ করেন তার অর্ধেকই কারোরই বোধগম্য হয় না।

আমাদের পৃথিবী আসলে অনেকটা মাল্টি ডাইমেনশন স্ক্রিনের মতো। বা বলা যেতে পারে একটি টাচ স্ক্রিন ট্যাবলেট বা কম্পিউটার। এবং অবশ্যই এটি একটি মাল্টি ডাইমেনশন প্রোগ্রাম। সুতরাং এখানে কমান্ড দিয়ে কাজ করা যায়, যেমনটা কম্পিউটারে হয়ে থাকে। কিন্তু এই কমান্ডটি সঠিক হতে হবে। এই যে মন্ত্রে সত্যি সত্যি ফল লাভ হয় তা বিস্তারিত ভাবে বর্ননা করবো।


এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।


আধুনিক বিজ্ঞানে মন্ত্রের প্রোয়োগ দেখা যায় যেমন দেখা যায় আরব্য রজনীর গল্পে। আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের যে গল্প আছে। সেখানে একটি মন্ত্রের কথা আছে। সেটা হলো চিচিং ফাঁক। একটা গুহার দরজা খুলতে এর ব্যবহার হতো। এটা একটা প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার। এই শব্দটা ঐ দরজার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। ফলে কেউ ওটা বললে তখন ম্যাচিং হতো আর তার ফলে দরজা খুলে যেত।

এরকম প্রোগ্রাম এখন মোবাইল ফোনে ভয়েস সার্চে হয়। আবার আমাজন কোম্পানির প্রোডাক্ট আলেক্সা তে এর প্রোয়োগ দেখা যায়। অটোমেটিক দরজা খোলা বন্ধ বা আলো জ্বলে ওঠা বা নিভে যাওয়া ঐ একই ভাবে কাজ করে।

মন্ত্রও ঠিক একই ভাবে কাজ করে। অর্থাৎ যদি মন্ত্র সঠিক উচ্চারণে পড়া যায় তবে অসাধ্য সাধন হতে পারে।

মন্ত্রের প্রকার

মন্ত্রের গঠন সাধারণত পাঁচ প্রকার হয়। একটি হলো বীজ, মানে বলা যেতে পারে ফলের বিচী যা থেকে বীজ তৈরী হয়। অর্থাৎ, বীজ হলো এক অসীম শক্তি যা অঙ্কুরিত হলে তা থেকে একটি বিশাল বৃক্ষ উৎপন্ন হতে পারে। মন্ত্রের বীজে রুপান্তরিত হওয়ার পিছনে মূল কারণ বা উদ্দেশ্য হলো গোপনীয়তা।

মন্ত্র রচনাকারীরা ভেবেছিলেন যে এই মন্ত্র যদি ভুল লোকের হাতে চলে যায় তবে তার ভূল প্রয়োগ হতে পারে। সেই জন্য গোপন সূত্রে সংকলিত করা হয়েছে। আর এই সংকলিত ধারাকেই বীজ বলে।

প্রধানত বীজ তিনটি শব্দের সংযোগে তৈরী হয়। তবে এর গঠনে অক্ষর নির্বাচন উচ্চারণের ভিত্তিতে হয়। যেমন ওঁ বা ওম। যদিও ওম এর সঠিক উচ্চারণ হলো ওউম বা অউম। এটি একটি বীজ যার অর্থ হলো হুংকার।

যারা কোন ফাঁকা স্থানে সিংহ বা বাঘের গর্জন বা হুংকার শুনেছেন। তারা প্রকৃত ধ্বনিটি জানেন। সেটি হলো অউম।

এখন দেখা যাক এর মধ্যে বা গঠনে কি শব্দের উচ্চারণ রয়েছে? ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর, অউমে রয়েছে ব্রহ্মার “অ”, বিষ্ণুর “উ” আর মহেশ্বরের “ম”। এই বীজ প্রয়োগে ত্রিদেবের শক্তিকে বোঝায়। আর সবাই জানে ত্রিদেবের শক্তিতে ক্যাত্যায়ানী দূর্গার উৎপত্তি। এবং দূর্গার শক্তির প্রতীক হলো সিংহ। কোথাও কোথাও দূর্গার বাহন হলো বাঘ। আর, অউম মানে হলো বাঘ বা সিংহের হুংকার বা ত্রিদেব এমনকি দূর্গা।

ওঁ বীজের ব্যবহার হয় শক্তির পুজোতে। এর সঠিক উচ্চারণে ঋণাত্মক শক্তির বিনাশ ঘটে।

দ্বিতীয়টি মানসিক বা মানত। এটি একটি বহুল প্রচলিত পন্থা যার দ্বারা কার্য সিদ্ধি সম্পন্ন হয়। এটি শুধুমাত্র সনাতন ধর্মে ব্যবহৃত হয় এরকম নয়, প্রায় সমস্ত ধর্মে মানত বা মানসিকের ব্যবহার আছে।

মানত বা মানসিকে ঈশ্বরকে শিখন্ডী করার রিতী লক্ষ্য করা যায়। যেমন নিম্ন বর্ণিত মন্ত্রে

শরীর বন্ধ কবচ

পরমেশ্বরে করি প্রনাম
তিনি রাখবেন নিজের সন্মান।।

ঋনাত্মক যত কিছু এ ধরাধামে
ভেদ করতে পারবে না, এ অধমে।।

কর্ম, শরীর, সন্মান
আর, রক্ষা হবে প্রাণ
কারন এই কবচ হলো ত্রাণ।।

জয় বলে, এই মন্ত্র ভেদে
গ্রহানু পতন হবে ধরায়, সেধে।

উপরোক্ত মন্ত্রে বলা হয়েছে “পরমেশ্বরে করি প্রনাম, তিনি রাখবেন নিজের সন্মান“। অর্থাৎ পরমেশ্বরকে শিখন্ডী করে মন্ত্র রচনা হয়েছে। এই ধরণের মন্ত্র বিশেষ ভাবে কার্যকরী এবং ফল দায়ক।

আর তৃতীয়টি দেব দেবীর বিবরণ বা স্তব। চতুর্থটি প্রনাম মন্ত্র আর পঞ্চমটি প্রার্থনা। আবার একই মন্ত্রে বর্ননা, প্রণাম ও প্রার্থনা যোগ করার রিতী লক্ষ্য করা যায়। স্তব বা স্তোত্রে সাধারণ ভাবে দেব দেবীর বর্ননা ও প্রনাম নিহিত থাকে। যেমন কালীকা স্তোত্রম

হুঁ হুঁ কারে শবারূঢ়ে নীল নীরদ রাজিদে,,
ত্রৈলোক্যৈক মুখে দিব্যে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।১

প্রত্যালীঢ়মহাঘোরে মুণ্ডমালা ( প্রলম্বিতে ) বিভূষিতে,,
খর্বে লম্বোদরে ( ভীমে ) ঘোরে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।২

নবযৌবনসম্পন্নে সজকুম্ভোপদ্মস্তনি,,
বানীশ্বরি শিবে শান্তে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৩

ললজ্জিহ্বে দূরারোহে নেত্রত্রয়বিভূষিতে,,
ঘোরহাস্যোৎকটাকারে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৪

ব্যাঘ্রাচর্মাম্বরধরে খড়্গকর্ত্তৃধরে করে,,
কপালেন্দীবরে বামে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৫

নীলোৎকট জটাভারে সিন্দূরেন্দু মুখোদরে,,
স্ফারবক্ত্রোষ্ঠ দশনে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৬

প্রলয়ানলধূম্রাভে চন্দ্রসূর্য্যাগ্নি লোচনে,,
শৈলাবামে শুভেমাতঃ কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৭

ব্রহ্মবিষ্ণুনোক্তজলৌঘে তু শবমধ্যে প্রসংস্থিতা,,
প্রেতকোটি সমাযুক্তে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৮

কৃপাময়ি হরেমাতঃ সর্বাশাপরিপূরণি,,
বরদে ভোগদে মোক্ষে কালিকায়ৈ নমোহস্তু তে ।।৯

ইত্যেতৎ কালিকাস্ত্রোত্রং যঃ পঠেদ্ ভক্তিসংযুতঃ,,
কৃতকৃত্যো ভবেন্ মন্ত্রী নাত্র কার্য্যা বিচারণা ।।১০

শ্রীকালিকা স্ত্রোত্রম সমাপ্তম্।।

এর বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়

যিঁনি “হুম” , “হুম” শব্দ করেন শবারূঢ়া , নীলপদ্মের মতো যাঁর নয়ন , ত্রিভুবন যাঁর একমুখ – সেই দিব্যকালিকাকে নমস্কার। ১

যাঁর বামপদ সম্মুখে প্রসারিত , দক্ষিণ পদ পশ্চাৎে , ঘোরা মুণ্ডমালা যাঁর গলায় লম্বিত , খর্বা – লম্বোদরী, ভীমা – সেই কালিকাকে নমস্কার।২

নবযৌবনসম্পন্না , গজকুম্ভ সদৃশ স্তন বিশিষ্টা, বাগীশ্বরী, শিবা , শান্তা সেই কালিকাকে নমস্কার।৩

যাঁর জিহ্বা বাইরে দীর্ঘ লম্বিত , হরের আলোকস্বরূপিণী ত্রিনেত্রা , ঘোর হাস্যকারিণী – – সেই কালিকাদেবীকে নমস্কার। ৪

বাঘের চর্ম রূপ বস্ত্রধারিনী, খড়্গকর্ত্তৃ হস্তে ধারণকারিণী , বাম হস্ত দ্বয়ে কপোল ও পদ্মধারিণী – সেই কালিকাকে নমস্কার।৫

নীলপদ্মের মতো জটাভারযূতে , সিন্দূর বর্ণের চন্দ্রের মতো সুন্দর মুখশ্রীযূতে মুখ, ওষ্ঠ ও দন্ত যাঁতে স্ফূরিত হচ্ছে সেইরূপ কালিকে তোমাকে নমস্কার।৬

প্রলয় অগ্নির ধূমের মতো কান্তিবিশিষ্টা , চন্দ্র- সূর্য- অগ্নি সদৃশ ত্রিনেত্র যুক্তা , শৈলবাসিণী হে মাতা শুভকালিকে তোমাকে নমস্কার। ৭

ব্রহ্মা ও বিষ্ণু যাঁর কাছে জলের প্রবাহের মতো, সেই শবমধ্যে দণ্ডায়মানা কোটি কোটি প্রেত সমন্বিতা কালিকে তোমায় নমস্কার। ৮

হে কৃপাময়ী, সকল আশার পরিপূরণকারিণী বরদা, ভোগদা, মোক্ষদায়িণী মাতা কালিকাদেবী তোমাকে নমস্কার।৯

কালীকা স্তোত্রম সমাপ্ত হলো।

উপরোক্ত মন্ত্রে দেবীর বর্ননার সাথে প্রনাম যোগ করা হয়েছে।

মন্ত্রের লিঙ্গ

মন্ত্রের গঠন লিঙ্গ নির্ভর, যা তিন প্রকারের হয়। পুং লিঙ্গ, স্ত্রী লিঙ্গ আর ক্লীব লিঙ্গ। এবং প্রয়োগও লিঙ্গ অনুযায়ী হয়।

ফট্ স্বাহা প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারের মন্ত্র হলো ক্লীব। অউম বা ওঁ হলো পুং লিঙ্গ। হ্রীঁ হলো স্ত্রী লিঙ্গ। তবে এগুলো সবই বীজ। সব থেকে শক্তিশালী মন্ত্র হলো পুং, স্ত্রী এবং ক্লীব লিঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত যে সকল মন্ত্র। তন্ত্রে এরকম কিছু মন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। যেগুলোর প্রয়োগে অসাধ্য সাধন দেখা যায়।

এই ব্লগটি ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি অনুসরণ করুন।


Discover more from Adhyatmik

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply