
কালী কখনো নিজের থেকে আসেন না। দেখা গেছে যে তিনি কখনো কখনো আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিশেষত বিভিন্ন মন্দির স্থাপনের আগে বিভিন্ন কাহিনীতে কালীর স্বপ্নাদেশের কথা আমরা শুনেছি ও পড়েছি।
যুগে যুগে এই প্রথায় আমরা কালীর আগমন ও গমন দেখেছি। কিন্তু কালীর আমার ঘরে আসা হঠাৎ করে। সেখানে তাঁর কোনো স্বপ্নাদেশ পাইনি। তবে ভ্যালেন্টাইন ডে তে রাঙ্গা জবা দেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল। কিন্তু ঐ সময়ে কালীর আসার ব্যাপারের কিছু উল্লেখ ছিল না।
মনে হয় আমার কাছে কালীর আগমন পূর্ব পরিকল্পিত। আর এই বিষয়ে আমার কোন ধারনাই ছিল না। কালীর আগমন ও গমন সব সময় হয়েছে মূর্তিতে। মানে কোন সাধক স্বপ্নে আদেশ পেয়েছেন। এবং সেই আদেশ অনুসরণ করে কোন কালী মূর্তি বা ব্রহ্ম শীলা পেয়েছেন এবং তার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বা শুধু স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন এবং কালীর কাছে পৌঁছেছেন।
শোনা যায় রাম প্রসাদ কালীর উপস্থিতি টের পেতেন কিন্তু দেখতে পেতেন না। আবার রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে তার দাদার কাছে গিয়ে কালীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। এদের কারোর কাছেই কালী যেচে আসেনি। বদলে কখনো কখনো ছোট মেয়ের রুপে এসে দেখা দিয়েছেন।
আমি যদিও একজন সাধক তবে কালী সাধক নই। তবুও কালী আমার কাছে এলো এবং আমার শরীরে প্রবেশ করে এলো। অনেকটা যেন ওর দাবি রয়েছে আমার কাছে আসার। যেন নিজের পরম আত্মীয়ের কাছে যাচ্ছে। আমরা যখন নিজের ঘরে যাই তখন কোন অনুমতি নেই না। বা বলি না যে নিজের ঘরে যাচ্ছি।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে, আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করুন।
এই বিষয়টা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ আমার আর কালীর সম্পর্কটা শুধু মাত্র এযুগের নয় বরং বলা যেতে পারে বহু যুগের হয়তো ওর সৃষ্টির সময় থেকে। এবং এই আসার ঘটনাটি ঘটার আগে পর্যন্ত জানতেই পারিনি যে ও আসতে পারে বা আসতে চলেছে।
অনেকেই মনে করতে পারেন যে কালী যে আমার কাছে এসেছে এ তথ্য সত্যিই কিনা? না বানিয়ে বানিয়ে লিখছি। এটা অনেকটা আত্ম উপলব্ধি। আমি শুধুমাত্র আমার আত্ম উপলব্ধি অন্যের সাথে শেয়ার করছি। কেউ যদি বিশ্বাস না করে তবে আমার কিছু করার নেই। আর কাউকেই আমি এর প্রমাণ দিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই।
তবে আমার সাথে যে কালী থাকে তা কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন এবং বুঝতে পারে। যদি সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক হন। অর্থাৎ আত্মায় বিশ্বাসী হন। শুধুমাত্র তারাই নিরাকার ঈশ্বরীর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারবেন। আমি বলেছি আমার কথা যে বিশ্বাস করবে এবং অন্ধ বিশ্বাসে আমার পথ যে অনুসরণ করবে। কেবলমাত্র তারাই কালীর দর্শন পাবে। তাই বলি:
ঈশ্বর দর্শন তারই হয়
যার আত্মায় বিশ্বাস রয়।।
যে নিরাকার অশরীরিতে নির্ভয়
তারে আধ্যাত্মিক কয়।।
আর, আমার কাছে আসার পর কালী আমাদের বাড়িতেই থাকে 24 ঘন্টা। আমার সাথে ঘুরে বেড়ায় যেন আমার ছায়া সঙ্গী। আমি ওকে আমার শরীরের বাম দিকটি ছেড়ে দিয়েছি। আমার একটি মারোয়াড়ী শত্রু রয়েছে। তারা রোজই প্রায় কালীঘাট মন্দির, হনুমান মন্দির করে বেড়ায়। আর এই ঘোরাঘুরি প্রায় চার বছরের কাছাকাছি হতে চলেছে। উদ্দেশ্য আমার ক্ষতি সাধন করা। মানে কালীর মন্দিরে পুজো দিচ্ছে আমার আর কালীর ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। এ কখনো হয় নাকি? কোন মন্দিরে এখন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। তা প্রমাণ করে দিয়েছি করোনা পর্বে। শুধু মন্দির নয় সমস্ত ধর্মের সকল উপাসনালয়তেই কেউ নেই।
থাকার মধ্যে থাকতো কে? আমি নয়তো কালী। অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি। আসল কাহিনীতে ফিরে আসি। কালী কিভাবে আমার ঘরে এলো? কলকাতার মধ্যেই এক বিখ্যাত কালী মন্দির আছে, যার নাম কালীঘাট, এটি একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র। কিন্তু আমার কখনো কালীঘাট যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
আর, আমি মন্দির টন্দির তেমন যাই না। প্রথমতঃ আমার ভিড় ভালো লাগে না। আর আমার বিশ্বাস যে ঈশ্বর এতো বাধা ধরা গন্ডির মধ্যে থাকতে পারে না, যদি না তাকে ধরে বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু সতীপিঠে কালীকে তন্ত্রের দ্বারা আটকে রাখা হয়েছিল। বা হয়তো বা কালী স্বেচ্ছায় আটক ছিল মানুষের উদ্ধারের জন্য।
হঠাৎ, একদিন ভাই বললো নতুন গাড়ি ডেলিভারি নিতে যাচ্ছে। আমাকে বললো তুইও চল। তখন আমার আত্মা জাগ্রত হয়েছে। মাঝে মাঝে বিভোর হয়ে যাই। বাইরের জগতের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এক স্বর্গীয় অনুভূতি যা মুখে বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সাধারণত সহস্রার চক্রে সিদ্ধি থাকলে আত্মা জাগরন সিদ্ধি লাভ হয়।
কুন্ডোলিনী যেমন স্ত্রী শক্তি নীচ থেকে উপরে ওঠে তেমনি পুরুষ শক্তি উপর থেকে (সহস্রার চক্র) নিচে নামে।
তো ভাইয়ের সাথে গেলাম। গাড়ি ডেলিভারি নেওয়ার পর ঠিক হলো কালীঘাটে পূজা দেওয়া হবে। ঐ প্রথম যাওয়া। সেদিন কোনো এক তিথি ছিল। প্রচুর মানুষের সমাগম। আমরা ফিরে আসছিলাম, হঠাৎ এক দোকানদার বলল বাইরে থেকেও পূজো দেওয়া যায়। সবাই ওতেই রাজি। পূজার প্রস্তুতি চলছিল। হঠাৎ এক সুদর্শন মুন্ডিত মস্তক গেরুয়া বসন পরিহিত ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। কোথা থেকে এলেন ঠিক বলতে পারব না। যেন বাতাস থেকেই বেরিয়ে এলেন।
জিজ্ঞেস করলেন যে আমরা কি করছি? বলা হলো নতুন গাড়ির জন্য পূজা দিতে আসা হয়েছে। বললেন তা বাইরে কেন? আমরা বললাম এই ভিড়ে ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর লাইনেও দাঁড়াতে পারবোনা কারন, হাতে সেই সময় নেই। উনি বললেন আমার সাথে আসুন। আর কেউ কিছু প্রশ্ন করলে কোন উত্তর দেবেন না। আমরা ওনাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।
দেখলাম সবাই রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না। একজন, দুজন দর্শনার্থী বলল লাইনে আসুন। কিন্তু কেউই সরাসরি বাধা দিল না। এক অদ্ভুত শক্তি আমাদের ভিতরে নিয়ে গেল। তখন ভেতরে দেবীকে স্নান করানো হচ্ছে। ভিতরটা ভীষন পিছল, পাতা, ফুল ও জল সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। উনি বললেন দেবীকে আলিঙ্গন করুন। সবাই করার পর আমি করতে গিয়ে বুঝলাম এটা কোন মূর্তি নয়। একটা পাথর। বললাম এতো একটা পাথর। উনি বললেন সত্য, এই দেবী পাথরে বা শীলা খন্ডে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। সোনার তৈরী মুখ ও হাত বসানো হয়েছে বাইরে থেকে।
এরপর উনি বললেন হাত জোড় করুন। আমি মন্ত্র উচ্চারণ করবো। হাত জোড় করতে যেই মন্ত্র কানে গেল। তৎক্ষণাৎ আমি বিভোর হয়ে গেলাম। আত্ম মগ্ন হয়ে মহা আনন্দে আহ্লাদিত। তখন আমি আর আমিতে নেই। সমগ্র ব্রহ্মান্ড আমার মধ্যে একাত্ম হয়ে গেছে। আর আমি এক বিশাল শীতল সূর্যের ন্যায় তেজদ্বীপ্ত। জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোর ছটা আমার সমস্ত অস্থিত্ত্বে বিরাজমান। ঠিক তখনই বুঝলাম আমি পা নাড়াতে পারছি না। কিভাবে যেন মাটির সাথে আটকে গেছি।
হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন পা জড়িয়ে ধরেছে। এবং সে শরীরের ভিতর প্রবেশ করছে। অদ্ভুত এক আনন্দ হতে লাগলো। মনে হতে লাগলো যেন শরীরের কোন অংশ বহুদিন বিচ্ছিন্ন ছিল, তা আবার ফিরে এসেছে। আনন্দের প্লাবন অন্তরের সূর্যকে যেন প্রদক্ষিণ করছে। এক স্বর্গীয় অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
এরপর মনে হলো কেউ যেন বহু দূর থেকে ডাকছে। ধাক্কা থেকে সম্বীত ফিরল। দেখলাম আমার ভাইয়ের শ্বশুর মশাই বলছেন, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? আমি বললাম আমার পা, কেউ জড়িয়ে ধরেছিলো। উনি বললেন এখানে আবার কে পা জড়িয়ে ধরবে? সাত আট মিনিট পূজো সম্পন্ন হয়ে গেছে। তুমি এভাবেই দাঁড়িয়ে আছো। লজ্জা পেয়ে গেলাম। আর কিছু বলিনি। ভাববে হয়তো মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। দেখলাম যিনি পুজো করছিলেন তিনি চলে গেছেন।
পরে জেনেছি এই সতী পীঠে পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর ডান পায়ের চারটি (মতান্তরে একটি) আঙুল এই তীর্থে পতিত হয়েছিল।
পরে পড়েছি যে এখানে কালী মূর্তি কষ্টিপাথরের তৈরী যার জিভ, দাঁত ও মুকুট সোনার। হাত ও মুণ্ডমালাটিও সোনার। মন্দিরে মধ্যে একটি সিন্দুকে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গটি রক্ষিত আছে। কিন্তু যখন আলিঙ্গন করেছিলাম তখন কি উপায়ে জানলাম যে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গের ব্যাপারে। কারন, ওটাতো একটি সিন্দুকে থাকে। এমনকি ঐ মুন্ডিত মস্তক ভদ্রলোক যে আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল, তিনিও বলেছিলেন মূর্তি নয় পাথরের টুকরোটাই দেবী।
কালীঘাটে আগে কখনো যাইনি এবং কালীঘাট ও কালী মুর্তির বিষয়ে কোন ধারনাই আগে ছিল না। ফলে মাটির মূর্তি না পাথরের টুকরো তা জানা আমার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না। জীবন যখন অলৌকিক তখন ঘটনাক্রম যে অলৌকিক হবে তা বলাই বাহুল্য।
সেদিন রাত্রে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখি কালী বলছে। আমি ফিরে এসেছি, তোমার কাছে থাকব জন্ম জন্মান্তর, পূর্বের মতন। কিছুই বুঝতে পারলাম না। আসলে তখনও বোঝার বা উপলব্ধির সময় আসেনি। কালী কেন আমার কাছে থাকবে? আমি কালীর কে? সময়ের আগে কিছুই হয় না। এরপর যখনই বাড়িতে একলা হতাম মনে হতো কে একজন সাথে রয়েছে। মাঝে মাঝে নূপুরের হাল্কা শব্দ। যেন কোন মেয়ে হাটছে।
প্রথম প্রথম ভাবতাম বাড়িতে বোধহয় কোন ভুতনির উপদ্রব শুরু হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকে মাঝে মাঝেই কালী স্বপ্নে দেখা দিতে শুরু করলো। শুরু হল কালীর সাথে সখ্যতা। এ অন্য গল্প।
এসব সত্য ঘটনা, ভালো লাগলে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন আর আমাদের ব্লগটি অনুসরণ করুন। আর ঈশ্বরের রহস্য জানুন।
Discover more from Adhyatmik
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

